গল্প: কিং কাকাই: দেবানন্দ সেনগুপ্ত


কাকাই আসছে শুনলেই আমাদের মনটা আনন্দে নেচে উঠত। কাকাই, অর্থাৎ বাবার ছোটো ভাইদের মধ্যে অন্যতম জমাটি মানুষ শ্রী জীবনানন্দ রায়। আর আমরা মানে আমি, অর্থাৎ বঙ্গীয় বিদ্যালয়ের ছাত্র শ্রী বাসব রায় ওরফে বাসু এবং আমার ছোটো তিন বোন ও মা-বাবা। কাকাই বয়সে আমার থেকে অনেকটাই বড়ো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশ করেছে। কিন্তু কাকাই আমার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশত।

কাকাইকে আমরা ‘কিং কাকাই’ নাম দিয়েছিলাম। ছোটোবেলায় আমরা কাকাইর কাছে করবেটের ম্যান-ইটার অথবা কিং কং-এর গল্প শুনে ভয়ে-বিস্ময়ে-রোমাঞ্চে আপ্লুত হতাম। বিশেষ করে কিং কং-এর কিং নায়ক আমাদের মুগ্ধ করেছিল। আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে আমাদের নায়ক কাকাইকেও কিং উপাধিতে ভূষিত করেছিলাম। তাই বলে ভেবো না কাকাইর ওইরকম গরিলা মার্কা চেহারা ছিল। কাকাইর রোগা লম্বা চেহারা আর টকটকে ফর্সা গায়ের রং ছিল, প্রকৃতই কিং বা রাজার মতো। কাকাই কলকাতার কাছাকাছি থাকলেও আমরা বাবার চা-বাগানের চাকরিসূত্রে আসামের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেইসময় থাকতাম। তাই কাকাই যেমন চট করে এখানে আসতে পারত না, তেমনি আমাদেরও কলকাতা যাওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না। বাবা ট্রাভেলিং অ্যালাউন্স সহ বড়ো ছুটি পেলেই এবং ছুটির সময় বাড়িতে (চা কোম্পানির বড়ো কোয়ার্টারস) থাকার (মানে পাহারা দেবার আর কী) লোক ঠিক হলেই আমরা সেখানে যেতাম।

যাই হোক, কাকাই এলে আমরা কী কী কর্মকাণ্ডের দ্বারা দারুণ আনন্দ করব সেটাই মাথায় ঘুরপাক খেত। তখন আনন্দের অল্প উপকরণই আমাদের কাছে অনেক মনে হত। একবার নির্দিষ্ট দিনে হাতে স্যুটকেস, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে কাকাইর আগমন হল। আমরা কাকাইকে ঘিরে ধরে তৎক্ষণাৎ সব গল্প শুনে নেওয়ার জন্য হইচই শুরু করলাম। মা বলল, “আরে বাবা, ঠাকুরপো আগে হাতমুখ ধুয়ে কিছু মুখে দিক, তারপর গল্প শুনবি। বেলা হয়ে গেছে, এখন জলখাবার না খেয়ে একবারে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে পারে। ঘন মুগের ডাল, আলুভাজা, কুচো চিংড়ি দিয়ে আলু-স্কোয়াশের তরকারি, নদীর টাটকা বোরলি মাছের সর্ষে-পাতুরি ও চাটনি—আজ আর বেশি কিছু হয়নি।”

শুনেই কাকাই বলল, “থাক থাক, আর বলার দরকার নেই। আমি একবারে চান করে এসে বসছি।”

খাবার খেতে খেতে নানারকম তৃপ্তিসূচক শব্দ করে কাকাই বোঝাল খাবার তার খুব পছন্দ হয়েছে। বোরলি মাছ খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল, “এখানে পাকা রুই-কাতলা কম ওঠে, তাই না?”

মা বলল, “খুব একটা দেখি না। রুই ওঠে, তবে কম। রুইয়ের মতোই দেখতে কালচে রঙের কালোবাউস মাছ ভালো পাওয়া যায়।”

কাকাই কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “বড়ো পাকা মাছ উঠবে কোথা থেকে, আগে তো জলে সঠিক চার দিতে হবে। আমার নিজের আবিষ্কৃত মাছের চার জলে দিলে বড়ো বড়ো রুই-কাতলাদের জ্যাঠামশাই-পিসেমশাইরা ভোট দেওয়ার মতো লাইন করে এসে ধরা দেবে। এই তো সেদিন গঙ্গায় ছিপ ফেলে ওই চার ছড়িয়ে দিলাম, তারপর বড়ো বড়ো মাছ টেনে তুলতে তুলতে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। অবশেষে কেজি পাঁচেকের মতো বড়ো মাছ রেখে বাকিগুলো জলে ছেড়ে দিলাম।”

শুনে আমি কাকাইকে বললাম, “এখানকার নদীতে তুমি সেই চার দিয়ে মাছ ধরে আমাদের খাওয়াবে তো?”

কাকাই চোখ ছোটো করে বলল, “বলছিস! ঠিক আছে, হয়ে যাক। শুধু দুটো ভালো ছিপ জোগাড় কর।”

আমি উৎসাহে নেচে উঠে বললাম, “ঠিক হয়ে যাবে, তুমি চার বানাতে শুরু করে দাও।”

ঠিক হল, আগামী রোববার কাকাই আর আমি পচা-লাইনের নদীতে মাছ ধরতে যাব। কাকাই শুঁটকি মাছ, পান্তা ভাত—আরো কীসব লতাপাতা চটকে সেদ্ধ করে চার তৈরি করল। এদিকে গন্ধে বাড়িতে সবাই অস্থির হয়ে গেল। বাবার সহকর্মী এসেছিলেন, তিনি নাক কুঁচকে বললেন, “দেখুন তো আপনাদের বাড়িতে ইঁদুর-টিদুর মরেছে বলে মনে হচ্ছে।”

বাবা, “তা হবে।” বলে প্রশ্নটা পাশ কাটিয়ে গেলেন।

যাই হোক, রোববার সকাল সকাল জলখাবার খেয়ে আমরা শিকারে বেরোলাম। দুজনের হাতে একজোড়া করে ছিপ-বড়শি, ফ্লাস্কে চা এবং এক প্যাকেট বিস্কুট আর ছাতা সঙ্গে নিয়ে আমাদের অভিযান শুরু করলাম।

নদীটা খুব একটা চওড়া নয়। বর্ষাকাল বাদ দিয়ে অন্য সময় হেঁটে পারাপার করা যায়। আমরা একটা জায়গা বেছে নিয়ে ছাতাটাকে একটা দণ্ডে বেঁধে তার তলায় বসলাম। কাকাই চার ছড়াল, তারপর ফাতনার উপর দৃষ্টি রেখে আরাম করে বসল। তারপর একঘণ্টা গেল, দু-ঘণ্টা গেল, মাছ আর ওঠে না। কাকাই মাঝে মাঝে ফ্লাস্কের থেকে চা খাচ্ছে আর বলছে, “ওঠ না বাবা! একটা হলেও ওঠ। প্রেস্টিজের ব্যাপার বলে কথা।”

এর মধ্যে কোথা থেকে একটা শুয়োর এসে আমাদের সঙ্গে আনা মাছের চার খেতে ঘন ঘন হামলা চালাচ্ছিল। ওটাকে তাড়াতে গিয়ে আমার একটা ছিপ ভেঙেই গেল। কাকাই বলল, “এক কাজ করা যাক, শুয়োরটাকে নিয়ে চল। আমরা বলব ওটাকেই আমরা ছিপ ফেলে তুলেছি।”

শুয়োরটা মনে হল কথাটা বুঝেই সবেগে পলায়ন করল।

আরো কিছু সময় সেখানে কাটিয়ে আমরা অগত্যা বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। ঝুড়ি মাথায় একটি লোক যাচ্ছিল। তার ঝুড়িটির মধ্যে কয়েকটি ছোটো পুঁটি মাছ ছিল। সে হাট থেকে মাছ বিক্রি করে ফিরছিল। কাকাই তার সঙ্গে ভাব জমাতে তাকে চা অফার করল। সে খেতে চাইল না। কাকাই তার কাছে দুটি পুঁটি মাছ কিনতে চাইল। লোকটা মাছ দুটি বিক্রি করল না, এমনি দিয়ে দিল, বোধ হয় ছিপ হাতে আমাদের হাল দেখেই। সেই মাছ দুজনে দুটো বড়শিতে গেঁথে বীরদর্পে বাড়ি ফিরলাম।

আমরা ফিরছি এটা দেখতে পেয়ে বাড়ির সবাই বাথরুমে জল রাখার বড়ো গামলা নিয়ে দাঁড়াল এসে। মা কাকাইকে বলল, “তোমার চারে তো কমপক্ষে পাঁচ কেজিমতো মাছ ওঠে, তাই বড়ো গামলা নিয়ে বসে আছি।”

তারপর আর কী? হাসাহাসি, মজা করা ইত্যাদি চলল সারাদিন।

আরেকবার কাকাই খুব জব্দ হয়েছিল। পুজোর ছুটিতে কাকাই এসেছে। বিজয়া দশমী পর্যন্ত দিনগুলি আনন্দে কাটছে। একদিন সন্ধ্যাবেলায় আমার মা প্রতিবেশীর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে, কাকাইর মাথায় চাপল বৌদি ফিরলে তাকে ভয় দেখাতে হবে। ঠিক হল, কাপালিক সেজে ভয় দেখাবে। গালে কপালে সিঁদুর লেপে, বাঘছালের মতো একটা চাদর কোমরে জড়িয়ে, হাতে টিনের খাঁড়া নিয়ে (যা নদীতে বিসর্জন হবার আগে দুর্গামূর্তির হাত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে) হুংকার দিয়ে বাড়িময় পায়চারি করতে শুরু করল। বৌদি এলে কী করা হবে তার ট্রায়াল দিচ্ছিল।

এদিকে কাকাইয়ের অজান্তে আমরা ভাইবোনেরা একটা প্ল্যান করলাম। বোনেরা আমাকে শাড়ি পরিয়ে মুখে মেক-আপ দিয়ে মেয়ে সাজিয়ে দিল। তারপর খিড়কি দরজা খুলে আমাকে বাইরে বের করে দিয়ে আবার দরজাটা বন্ধ করে দিল। এদিকে হয়েছে কী, কাকাই আমাদের বাড়ির কাজের আদিবাসী ছেলেটিকে দোকান থেকে সিগারেট আনতে পাঠিয়েছে এবং তাকে বলে দিয়েছে যেন সে খিড়কি দরজার বাইরে এসে ঠকঠক শব্দ করে (সদর দরজা দিয়ে বাবা আসার সময় হয়েছে, তাই সিগারেট লুকোবার ব্যাপার রয়েছে)। মেয়ে সেজে আমি খিড়কি দরজায় ঠকঠক করতেই কাকাই ভাবল সেই ছেলেটা এসেছে। ওই কাপালিক বেশেই নিশ্চিন্ত মনে কাকাই দরজা খুলল। দরজার বাইরে আলো-আঁধারে কাকাই দেখল একজন ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে। কাকাইকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেখে আমি গলা সরু করে বললাম, “বনানী (আমার পরে যে বোন, তার নাম) আছে?”

কাকাই অপ্রস্তুত হয়ে কোনোরকমে ‘আছে’ বলেই একছুটে ঘরের ভেতরে এসে এ-ঘর সে-ঘর ঘুরে কোথায় লুকোবে সেই চেষ্টা করতে লাগল। আমার বোনকে দেখতে পেয়ে বলল, “ছি ছি, কী কাণ্ড! এক ভদ্রমহিলা এসেছেন আর আমি এই বেশে... ছি ছি, কী ভাববেন!”

প্রসঙ্গত কাকাই তখন একটি কলেজে লেকচারার-রূপে কাজ করছিল। এদিকে আমি নারীবেশে কাকাই যে ঘরে যাচ্ছে ইচ্ছে করেই সেখানে চলে আসছি ‘বনানী আছ?’ বলে।

ইতিমধ্যে মা চলে এসেছে। তারপর ব্যাপারটা বুঝে সবাই খুব হাসাহাসি করা হল। কাকাই বলল, “বাসু, তুই আমাকে যে শক দিলি তা চিরকাল মনে থাকবে।”

কাকাইর কাণ্ডকারখানার শেষ এপিসোডটা বলে গল্প থামাব। এখানে বিজয়া দশমী থেকে লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত বা আরো কিছুদিন প্রত্যেক বাড়িতে কিছু কিছু শুকনো মিষ্টি আর নোনতা মুচমুচে খাবার তৈরি করে রাখা হত। কুচো ও বড়ো নিমকি, মিষ্টি নিমকি, নারকেল দিয়ে তৈরি নানারকম খাবার যেমন ছাঁচের নানা আকৃতির (শঙ্খ বা কিছু লেখা) সন্দেশ, নাড়ু (চিনির গুড়ের ও তিলের) এবং খুরমা তৈরি হত। রসের মিষ্টি কম করা হলেও জিবেগজা, ভেতরে মিষ্টি পুর দিয়ে ওপরে শুকনো ভেতরে সরস পিঠে তৈরি হত। আর কেনা মিষ্টির মধ্যে শুধু রসগোল্লা আর পান্তুয়া থাকত। সেই সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিজয়ার শুভ সম্ভাষণ জানানো আর প্লেটে রকমফের খাবারের স্বাদ উপভোগ করার ব্যাপারটাই ছিল আকর্ষণের।

সেই মিষ্টিমধুর সময়ে কাকাই আমাদের বাড়িতে এসেছিল, সঙ্গে কলকাতার কলেজে পড়া আমার দিদি আর আমাদের প্রিয় ঠাকুরমা। কাকাই তখন অধ্যাপক জীবনানন্দ রায়। বাইরে অধ্যাপকের একটা আবরণ ধরে রাখলেও ভেতরে কাকাই সেই আদি ও অকৃত্রিম কাকাই-ই ছিল। সারাদিন খাওয়াদাওয়া, ছবি তোলা—এইভাবেই হইহই করে সময় কাটত। কিন্তু কাকাইর কাণ্ডকারখানার লক্ষ্মণরেখা পার হওয়া ব্যাপারটা মাঝে মাঝে ঘটে যেত। তেমনি একটির বর্ণনা দিই।

হঠাৎ একদিন কাকাইয়ের মাথায় চাপল, বাড়িতে নিজের হাতে সিদ্ধি বা ভাংয়ের শরবত বানিয়ে খাবে। কাজের আদিবাসী ছেলেটি কাকাইর আদেশ পালন করতে একপায়ে খাড়া। সে বলল, “ভাং পাতা আমি এনে দেব।”

ছেলেটি ভাং আনতে গেল আর কাকাই শরবতের উপকরণ যেমন বাদাম বাটা, নারকেল-বাতাসা গুঁড়ো ইত্যাদি তৈরি করতে লেগে গেল। আমার মাকে ডেকে বলল, “বৌদি, দারুণ শরবত হবে, যা খেলে গায়ের সব ব্যথাবেদনা দূর হয়ে যাবে।”

মা বলল, “রক্ষা করো, আমি এসব খেতে পারব না।”

যাই হোক, ছেলেটি ভাং নিয়ে এলে তা মিহি করে বেটে শরবত তৈরি হল।

সেদিন বোনেদের গৃহশিক্ষক অভয়দা (চা কোম্পানিতে চাকরি করত) আমাদের বাড়িতে এসেছিল। কাকাই তাকে শরবত অফার করলে সে সানন্দে খেতে রাজি হয়ে গেল। যদিও তাকে বাড়ি পৌঁছতে অনেকটা সাইকেল চালিয়ে যেতে হবে। তবে কাকাই অভয়কে অভয় দিয়ে বলল, “জিনিসটা একটু পাতলা হয়ে গিয়েছে, তাই খুব একটা অ্যাকশন হবে না বলেই মনে হয়।”

বৈঠকখানা ঘরে কাকাই, অভয়দা ও আমি কাচের গ্লাস, শরবত রাখার জাগ এবং একথালা রসগোল্লা নিয়ে বসলাম। বাবা মিটিংয়ে গিয়েছে, ফিরতে রাত হবে। তাই আমরা নিশ্চিন্ত মনে আমাদের সিদ্ধি সেশন শুরু করলাম। কাকাই আমাকে সতর্ক করে দিল, “বাসু, তুই অল্প খাবি। সহ্য হবে না।”

আমি বীরত্ব দেখিয়ে বললাম, “না না, আমি একবার খেয়ে দেখেছি, নেশা হয়নি।”

যাই হোক, আমি এক গ্লাস একটু একটু করে খেলাম আর সঙ্গে রসগোল্লা। কাকাই ততক্ষণে দু-গ্লাস শেষ করে ফেলে রসগোল্লা গোটা ছয়েক গলাধঃকরণ করে ফেলেছে। আমার বড়দি এসে একবার দেখে গেল সত্যি আমাদের কিছু নেশা হয়েছে কি না। দিদিভাইয়ের গোয়েন্দা তদন্ত করবার মতো ভঙ্গি দেখে আমি জোরে হেসে ফেললাম। ব্যস, তারপরেই আমি অনুভব করলাম কষ্টকর কাশির মতো আমার মাঝে মাঝে দমকা হাসি ছিটকে বেরোচ্ছে। কাকাই আমাকে সতর্ক করে বলল, “বাসু, কন্ট্রোল কর।”

আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে আবার পরমুহূর্তেই হিহি করে হেসে উঠছি।

“বাসু! কন্ট্রোল কর।” আবার সাবধানবাণী কাকাইর।

আমি এবার পাশের ঘরে ঢুকে গেলাম। সেখান থেকে মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছি আর অপ্রতিরোধ্য হিহি হাসির স্রোত বইয়ে দিচ্ছি। তিন গ্লাস খাওয়ার পর এবার কাকাইকে হঠাৎ অস্থিরতা প্রকাশ করতে দেখা গেল। মাস্টার অভয় বোধ হয় ভয়কে জয় বা এনজয় করতে না পেরে বলল, “কাকু, আমি এবার বাড়ি যাই। সাইকেলে অনেকটা পথ যেতে হবে।”

মাস্টার বিদায় নিল। কাকাই রাত্রির খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল।

এবার শুরু হল কিং কাকাই কাহিনির চূড়ান্ত পর্ব। কাকাইর মনে হল, তাঁর শরীরটা হঠাৎ পালকের মতো হালকা হয়ে যাচ্ছে এবং শরীর ও শরীরের যন্ত্রপাতিগুলি কেবল ছিটকে ছিটকে উড়ে যেতে চাইছে। কাকাই আর্তনাদ করে বলছে, “সব কোলাপ্স করে যাচ্ছে!”

তারপর হাত-পা সবেগে আন্দোলিত করতে শুরু করল। মা, দিদিভাই কাকাইকে স্থির হতে এবং বিছানায় শুয়ে পড়তে বললে কাকাই কাতর স্বরে বলল, “স্ট্রাগল করে যাচ্ছি। শুলেই পরাস্ত। এখনই হাওয়ায় উড়ে যাব, আমাকে তোমরা টেনে ধরে রাখো।”

এবার আমার মা ও ঠাকুরমার মুখে দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। এই নেশার অ্যান্টিডোট বা প্রতিষেধক কারো তেমন কিছু জানা ছিল না। প্রতিবেশিনী বয়স্কা মাসিমা ছোটোদের কাছে খবর পেয়ে দ্রুত আমাদের বাড়িতে এলেন। তিনি বললেন, “শুনেছি টক খেলে উপকার হয়।”

শুনে আমার মা তাড়াতাড়ি একটা বাটিতে তেঁতুল গুলতে শুরু করল।

এদিকে অবস্থা গুরুতর হতে শুরু করল। আমার ঠাকুরমা, কাকাই ও প্রতিবেশিনী মাসিমা তিনজনই লম্বা এবং সেই তুলনায় আমার মা বেশ বেঁটে। দেখা গেল, বারান্দায় কাকাই সোজা দাঁড়িয়ে যেন উপরে উঠে যাচ্ছে এমন ভঙ্গিমা করছে, আর তার দু-দিকে দুই বয়স্কা—ঠাকুরমা ও মাসিমা কাকাইর হাতদুটো টেনে ধরে রেখেছে। ফলে দেখা গেল, তিনজনই সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উপরে উঠছে ও নামছে। আরো চমকপ্রদ হল, আমার মা একবাটি তেঁতুলগোলা জল নিয়ে লম্বা কাকাইয়ের মুখে দেওয়ার প্রচেষ্টায় সমানে লাফিয়ে যাচ্ছে অর্থাৎ তাঁকেও স্ট্রাগল করতে হচ্ছে। এই সমবেত স্ট্রাগলের ফলে দেখা গেল চারজনেই ঢেউয়ের মতো লাফাচ্ছে আর পাশের বাড়ি থেকে আসা কচিকাঁচারা আনন্দে হাততালি দিয়ে লাফাচ্ছে। আমি সম্ভবত ভয় পেয়েছিলাম, তাই লাফালাফিতে না গিয়ে হাসি বন্ধ করে কাঁদো কাঁদো হয়ে বসে ছিলাম।

কাকাই ঠাকুরমাকে বলল, “মা, তোমার ভগবানকে ডাকো।” এরপর ওই লম্ফরত অবস্থায় কাকাই ইংরেজিতে ‘গড সেভ দ্য কিং’ ধরনের সংলাপ বলতে শুরু করল।

কেউ একজন হসপিটালে খবর দিয়েছিল। রাতে ডাক্তারবাবুরা সাধারণত কারো বাড়িতে ভিজিট করেন না। অগত্যা কমপাউন্ডার মহাশয়কেই এইসব ব্যাপারে যেতে হয়। এবারও সাদা শার্ট ও সাদা প্যান্ট পরা (ঢোলা প্যান্টের তলা তখন প্রচলিত টিনের রিং-এ বাঁধা), সঙ্গে সাইকেল এবং ওষুধপত্র রাখার মোটা চামড়ার ব্যাগ নিয়ে কম্পাউন্ডার আবির্ভূত হলেন। তাঁকে দেখতে পাওয়ামাত্র কাকাই চিৎকার করে বলল, “ও ডক্টর, প্লিজ কাম, আই অ্যাম স্ট্রাগলিং ফর মাই লাইফ, গড সেভ দ্য কিং।”

কমপাউন্ডার মিত্রবাবু ওই সমবেত নৃত্য ও ওই ইংরেজি বাণী শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। তাঁর আলগা হাত থেকে দড়াম করে সাইকেল পড়ে গেল; হাতের ব্যাগটা কোনোক্রমে সামলালেন। কাকাই তখনো বলেই চলেছে, “ডক্টর, সেভ মাই লাইফ, আই অ্যাম ফ্লাইং অ্যান্ড ডাইং। কিং সেভ দ্য গড!”

ততক্ষণে বাবা এসে গেছেন। সব শুনে আমাকে বাবা বকা দিচ্ছিলেন। তাই শুনে কাকাই ওই অবস্থাতেই বাবাকে বলল, “বড়দা, ওকে বোকো না। হি ইজ ইনোসেন্ট, আই অ্যাম দ্য কালপ্রিট। গড সেভ দ্য কালপ্রিট।”

একটু ধাতস্থ হয়ে মিত্রবাবু বললেন, “আরো তেঁতুলগোলা জল খাইয়ে দিন। আমি একটা ইঞ্জেকশন দিচ্ছি, তারপর ঘুমিয়ে সুস্থ হবেন।”

তেঁতুলগোলা জল খেয়ে কাকাই অনেকটা বমি করে নেতিয়ে গেল। মিত্রবাবু আরো কিছুক্ষণ থেকে প্রস্থান করলেন। বাইরের লোকেরাও চলে গেলেন। আমিও তেঁতুলগোলা জল খেয়ে কাকাইর সঙ্গে ঘুম লাগালাম।

সকালে অনেক দেরিতে আমার আর কাকাইর ঘুম ভাঙল। কাকাই সবাইকে দেখে হেসে বলল, “প্রতিজ্ঞা করছি, আর ওই জিনিস ছোঁব না।”

শুনলাম, শরবত তৈরি হয়েছিল যে বস্তুটি দিয়ে তাতে কাঁচা গাঁজাপাতা মেশানো ছিল। আর কাকাইয়ের অম্বলের দোষ ছিল, তাই ওইরকম কষ্টকর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল।

মা বলল, “ঠাকুরপোর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছিল।”

এদিকে পাড়ার সাধারণ লোকেরা বলাবলি করেছিল যে অমুকবাবুর ভাই, কলেজের প্রফেসর, রাতে নেশা করে গণ্ডগোল করেছে। কাকাই শুনে দুঃখে মাথা নেড়েছিল শুধু, আর বলেছিল, “কী লজ্জা, কী লজ্জা।”

সিদ্ধি নিয়ে এরকম অনেক মজার ঘটনা ঘটে বলে একে অনেকে নির্দোষ নেশা ভাবেন। পুজোমণ্ডপেও রসিকজনের সেবার জন্য অনেক সময় তা রাখা থাকে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে শরীরের হালবিশেষে এবং সংমিশ্রণের ত্রুটিতে এই বস্তু মানুষের প্রাণসংশয় পর্যন্ত ঘটাতে পারে। মজা করতে গিয়ে মরতে বসায় গৌরবের অবকাশ কম। অতএব, সাধু সাবধান।

শেষ করার আগে সেই মাস্টার অভয়বাবুর শরবত পানের ফল কী হয়েছিল বলে যাই। পরে তার সঙ্গে একদিন কথা হলে সে বলল, “সেদিন আমাকে সাইকেলে যেতে খুব পরিশ্রম করতে হয়েছে। এখান থেকে আমার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা হঠাৎ পাহাড়ি অঞ্চলের রাস্তার মতো উঁচু হয়ে গেছে বলে বোধ হল। আমি অনেক জোর প্যাডেল করে তবে ওই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছি। ভাগ্যিস, শরবতটা বেশি খাইনি। নাহলে হয়তো সাইকেল নিয়ে হিমালয়ের টপে উঠে যেতে হত।”

সত্যি, লাইফ ইজ আ কন্টিনিউয়াস স্ট্রাগল।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ সুমন দাস


No comments:

Post a Comment