গল্প: ভাঙা ডিমের রহস্য: নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য


সন্ধের দিকে প্রাচীদের বাড়িতে গিয়ে রিমঝিম দেখল ওর বন্ধু গালে হাত দিয়ে গোমড়া মুখে বারান্দায় বসে আছে।

“কী হয়েছে রে তোর? আজ পার্কে খেলতে এলি না কেন?” জিজ্ঞেস করল রিমঝিম।

বিষন্ন মুখটা তুলে প্রাচী বলল, “বাড়িতে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। বুঝতে পারছি না কী করব।”

প্রাচীর পাশে বসে পড়ে রিমঝিম ওর কাঁধে হাত রাখল। “পরীক্ষায় তো তুই এবার ভালোই নম্বর পেয়েছিস, তবে আবার কীসের সমস্যা?”

ফোঁস করে একটা বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে প্রাচী বলল, “না রে, রেজাল্ট নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। ব্যাপারটা একটু গোলমেলে, ছোটোখাটো একটা রহস্যই বলতে পারিস।”

রহস্যের কথায় রিমঝিমের চোখ বড়ো হল। স্কুলের লাইব্রেরি থেকে সুযোগ পেলেই ও আগাথা ক্রিস্টি আর ফেলুদা সিরিজের বইগুলো এনে হোম-ওয়ার্কের ফাঁকে পড়ে নেয়। রহস্যের গন্ধ পেয়ে প্রাচীর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল রিমঝিম। “খুলে বল না আমাকে একটু প্লি-জ!”

প্রাচী ম্লান হেসে বলল, “ফেলুদা আর আগাথা ক্রিস্টি পড়ে তোরও দেখছি গোয়েন্দাগিরি করার শখ হয়েছে, তাই না? শোন তাহলে। গতমাসে বাবা ঘন্টুদের পোল্ট্রি থেকে তিনটে মুরগি কিনে এনেছিলেন, তোকে বলেছিলাম না?”

রিমঝিম মাথা দোলাল। “হ্যাঁ, বলেছিলি বৈকি। ওরা রোজ একটা করে ডিম দিচ্ছে আর তোরা সবাই খুব ওমলেট আর পুডিং খাচ্ছিস—সে খবরটাও দিয়েছিলি।”

“আর তোকে যে টিফিনে মার হাতের পুডিং খাইয়েছি, কই, সে কথাটা তো বললি না!”

রিমঝিম হেসে বলল, “ভেরি সরি। সত্যি, খুব ভালো পুডিং বানিয়েছিলেন মাসিমা। আবার কবে পুডিং খাওয়াবি বল।”

প্রাচী ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “পুডিং-টুডিং সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে।”

রিমঝিম চোখ কপালে তুলে বলল, “কেন? মুরগিগুলো এরই মধ্যে পটল তুলল? কই, বলিসনি তো আমাকে!”

“ওগুলো সব বহাল তবিয়তেই আছে। শুধু একটা মুরগি ডিম দেওয়া বন্ধ করেছে, বাকি দুটো রোজ একটা করে ডিম পাড়ে। কিন্তু কে যেন রাতে এসে ওদের ডিমগুলো ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে।”

রিমঝিম বলল, “সে কি রে, মুরগি তো তোরা খাঁচায় রেখেছিস আর তোদের বাড়ির চারপাশে দেয়ালও আছে। দেয়াল টপকে কে আসবে ডিম ভাঙতে?”

প্রাচী বলল, “সেটাই তো রহস্য।”

“তোর বাবা কী বলেন?” রিমঝিম জানতে চাইল।

“পরপর তিনদিন সকালে উঠে ভাঙা ডিম দেখে বাবা খেপে গিয়ে আজ মাকে বলে দিলেন যে ওগুলোকে তিনি ঘন্টুকে বিক্রি করে দেবেন। অ্যাদ্দিন মুরগিগুলোকে দানা খাইয়ে ওদের ওপর আমার এত মায়া পড়ে গেছে যে আমি তো কেঁদেই ফেললাম। তাই দেখে মা শেষে বাবাকে রাজি করিয়েছেন আরো দুটো দিন মুরগিগুলোকে রাখতে। এর মধ্যে যদি সমস্যার কোনো সমাধান না হয় তবে ওগুলো ফিরে যাবে ঘন্টুর পোল্ট্রিতে।”

রিমঝিম বলল, “তোদের রোজ তাজা ডিম খাবার সুন্দর প্ল্যানটা এত তাড়াতাড়ি ফেল করে গেল শুনে খুব দুঃখ হচ্ছে রে। চল তো একবার খাঁচাটা দেখে আসি।”

“কী করবি তুই খাঁচা দেখে?” জানতে চাইল প্রাচী।

“দেখি রহস্যের যদি কোনো সমাধান খুঁজে পাই।”

“কাম অ্যালং, মিস মার্পল।”

এই বলে ঘরের মধ্য দিয়ে প্রাচী রিমঝিমকে টেনে নিয়ে গেল ওদের বাড়ির পেছনের উঠানে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে প্রাচীর মা রিমঝিমকে দেখতে পেয়ে বললেন, “খাঁচা দেখতে যাচ্ছ? যাও দেখে এসো গিয়ে। দু-দিন পরে তো মুরগি সমেত ওটা চলে যাবে ঘন্টুর জিম্মায়। পই পই করে বারণ করেছিলুম তোমার মেসোমশাইকে মুরগি ঘরে না আনতে, তা শুনল আমার কথা? সস্তায় তাজা ডিম খাবার শখ মিটল এতদিনে। এখন আপদ বিদেয় হলে বাঁচি।”

রিমঝিম হেসে বলল, “মাসিমা, আপনি যদি আবার আস্ত ডিম পান, তবে মুরগিগুলোকে রাখবেন তো?”

প্রাচীর মা বললেন, “আস্ত ডিম আমাদের কপালে নেই বাছা। ওই মুরগিগুলোর উপর শনির দৃষ্টি পড়েছে। না হলে দেয়াল ডিঙিয়ে এসে কে রোজ রাতে ডিম নষ্ট করে যাবে বলো?”

“সেটাই তো আমাদের ভালোভাবে বুঝবার চেষ্টা করতে হবে মাসিমা।” রিমঝিম বলল। “আর ওটা বুঝে ফেললে ডিমগুলোকেও বাঁচানো যাবে।”

প্রাচীর মা হেসে বললেন, “যদি তুমি ডিম রক্ষা করতে পারো তবে তোমাকে খুব ভালো পুডিং করে খাওয়াব।”

“থ্যাঙ্ক ইউ মাসিমা।”

প্রাচীর মা রান্নাঘরের জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের কাজে মন দিলেন আর রিমঝিম লেগে গেল ওর তদন্তের কাজে। ও দেখল খাঁচাটা বেশ শক্তপোক্ত, কোথাও কোনো ফাঁক নেই। খাঁচার দরজাটাও বেশ মজবুত, ভালোভাবে আটকানো। খাঁচার মধ্যে খড় বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে আর মুরগির খাবার জন্য রাখা হয়েছে দুটো মাটির পাত্র। একটাতে রয়েছে কিছু গমের দানা, ফলের টুকরো আর দ্বিতীয়টাতে আছে জল। রিমঝিম তাকিয়ে দেখল মুরগি তিনটেই বেশ বড়ো সাইজের, লালচে রঙের। দুটো মুরগি খুঁটে খুঁটে দানা খাচ্ছিল আর তৃতীয়টা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল এককোণে। প্রাচী ওকে বলেছিল, এই দেশি মুরগি তিনটে কিনতে ওর বাবাকে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়েছে ঘন্টুকে।

খাঁচা দেখার পর রিমঝিম তাকাল দেয়ালের দিকে। দেয়াল বেশ উঁচু আর ওর ওপরে লাগানো আছে এক ফুট উঁচু তারকাঁটা। রিমঝিম স্পষ্টই বুঝতে পারল বাইরে থেকে কোনো বেড়াল, কুকুর বা অন্যপ্রাণী এত উঁচু দেয়াল আর তারকাঁটা ডিঙিয়ে এপাশে আসতে পারে না। তাহলে কে ডিম ভেঙে দিয়ে যায় রোজ রাতে?

“আচ্ছা, তোদের বাড়িতে কোনো বেড়াল-কুকুর আছে এখন?” জিজ্ঞেস করল রিমঝিম।

প্রাচী মাথা ঝাঁকাল। “দু-বছর আগে ভুলু মারা যাবার পর আর কোনো কুকুর কেনেননি বাবা। বেড়াল তো মা পছন্দ করেন না, তাই কোনোদিন রাখা হয়নি।”

“তোদের মুরগিগুলো ডিম দেয় কখন জানিস তুই?”

“রাত বারোটা থেকে ভোর পাঁচটার মধ্যে।”

“কী করে জানলি এই সময়টা?”

প্রাচী বলল, “বাবা বারোটার আগে ঘুমোন না। ঘুমোতে যাবার আগে টর্চ নিয়ে বাবা এসে খাঁচা ভালোভাবে দেখে যান। তখন অবধি মুরগিদুটো ডিম দেয় না। আর ভোর পাঁচটায় মা উঠে ডিম আনতে গিয়ে দেখেন ডিমগুলো কেউ ভেঙে দিয়ে গেছে।”

রিমঝিম একটু ভেবে নিয়ে বলল, “আচ্ছা, কোন মুরগিটা ডিম দেওয়া বন্ধ করেছে দেখিয়ে দিতে পারবি?”

“কেন পারব না? ওই যে যেটা এককোণে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, ওটাই কয়েকদিন হল ডিম দেওয়া বন্ধ করেছে।”

রিমঝিম এবার চোখ বুঝে চিন্তা করতে লাগল। ওর মনে হল এতক্ষণে ও একটা আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছে। “আচ্ছা, যতদিন তিনটে মুরগিই ডিম দিত ততদিন তো কেউ ডিম ভাঙেনি, তাই না?”

প্রাচী ভ্রূ কুঁচকে বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু তুই কী বলতে চাস একটু খুলে বলবি তো!”

রিমঝিম হেসে বলল, “সেটা এখন বলা যাবে না। শোন, আমার ইনভেস্টিগেশন কমপ্লিট। এবার অ্যাকশনে নেমে পড়তে হবে।”

“তার মানে?”

“আজ আমি তোদের বাড়িতেই রাত কাটাব।”

প্রাচী খুশি হয়ে বলল, “সেটা খুব ভালো হবে রে। রাতে শুয়ে শুয়ে তোর সঙ্গে অনেক গল্প করা যাবে।”

“বিছানায় শুয়ে তোর সঙ্গে গল্প করার জন্য তোর বাড়িতে রাত কাটাব কী করে ভাবলি তুই? আমি না মিস মার্পল?”

প্রাচী জিভ কেটে বলল, “ও হ্যাঁ, তাই তো। ভুল হয়ে গিয়েছে ম্যাডাম। তা কী করবেন মিস মার্পল সারারাত ধরে জানতে পারি?”

রিমঝিম মুখে গম্ভীর ভাব এনে বলল, “খাঁচা পাহারা দেব মাঝরাত থেকে। আর তোকেও রাত জাগতে হবে আমার সঙ্গে। পারবি তো?”

“অ্যাজ ইওর অ্যাসিস্ট্যান্ট?”

“রাইট ইউ আর। যা, এবার চট করে মাসিমাকে দিয়ে আমার মাকে একটা টেলিফোন করিয়ে দিয়ে আয়।”

“ডান।” বলল প্রাচী।


রিমঝিমের প্ল্যান অনুযায়ী রাত ন’টার মধ্যে খাওয়াদাওয়া সেরে, ঘড়িতে বারোটার অ্যালার্ম দিয়ে ওরা দুজন শুয়ে পড়ল। তারপর ঠিক মাঝরাতে উঠে বাড়ির পেছনের বারান্দায় ওরা দুটো চেয়ার পেতে চাদর মুড়ি দিয়ে বসল খাঁচা পাহারা দিতে। সঙ্গে রইল জলের বোতল, ছোটো একটি টর্চ আর কয়েক টুকরো চকোলেট। রিমঝিমের অনুরোধে প্রাচীর বাবা বারান্দায় একটা অল্প পাওয়ারের সবুজ লাইট জ্বালিয়ে দিলেন। হালকা আলোয় রিমঝিম দেখল খাঁচার মধ্যে তিনটে মুরগি মাথা গুঁজে একপায়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। প্রাচীকে জাগিয়ে রাখার জন্য রিমঝিম ওকে হ্যারি পটার শোনাতে আরম্ভ করল, কিন্তু কয়েকবার হুঁ হাঁ করে প্রাচী চোখ বুজল। মুখে একটুকরো চকোলেট পুরে হাতে টর্চ নিয়ে জেগে রইল রিমঝিম।

শেষরাতের দিকে যখন ওর চোখ প্রায় বুজে আসছিল তখনই খাঁচার মধ্যে সেই অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটল যার জন্য রিমঝিম প্রতীক্ষা করে বসে ছিল এতটা সময়। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ও দেখল রাত তখন চারটা বেজে পঁচিশ মিনিট। রিমঝিম দেখল দুটো মুরগি খাঁচার এককোনায় এসে দুটো ডিম পেড়ে ফিরে গেল নিজেদের জায়গায়। একটু পরেই ডিম না দেওয়া তৃতীয় মুরগিটা চলে এল ডিমদুটোর কাছে। তারপর ঘাড় বেঁকিয়ে রাজকীয় কায়দায় ডিমদুটোকে একনজর দেখে নিয়ে ও ঠকাস করে মারল ঠোঁটের ঘা একটা ডিমে। ফেটে গিয়ে ডিমের হলুদ কুসুম ছড়িয়ে পড়ল খাঁচার মেঝেতে বিছানো খড়কুটোর মধ্যে। দ্বিতীয় ডিমটিকেও একইভাবে ভেঙে দিয়ে দুষ্টু মুরগিটা ফিরে গেল নিজের জায়গায়।

রিমঝিম এবার ঠেলে তুলল প্রাচীকে। ধড়মড় করে উঠে প্রাচী বলল, “কী হল?”

“কেস সলভড।” বলল রিমঝিম একগাল হেসে। “তোদের ওই ডিম না দেওয়া মুরগিটাই ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ভাঙছিল ডিমগুলো। ও শুধু নিজের অক্ষমতার আক্রোশ মেটাচ্ছে ওর সঙ্গীদের ডিম ভেঙে দিয়ে। শি ইজ জাস্ট আ জিলাস হেন।”

প্রাচী বলল, “হাউ স্ট্রেঞ্জ! আজই বাবাকে বলে ওটাকে ফেরত পাঠাব ঘন্টুর পোল্ট্রিতে।”

“কিংবা খাঁচায় একটা পার্টিশন করে ওকে আলাদা করে রাখতে পারিস। ও আবার যখন ডিম পাড়তে শুরু করবে তখন পার্টিশনটা হটিয়ে দিবি।”

“গ্রেট আইডিয়া! অ্যান্ড থ্যাঙ্কস আ লট, মিস মার্পল।”

“আমার গোয়েন্দাগিরির ফি-টা কিন্তু পাওনা রইল, জানিয়ে দিস মাসিমাকে।” এই বলে তুড়ি মেরে শিস দিতে দিতে বাড়ি চলে এল রিমঝিম।

তিনদিন পর স্কুলে টিফিনের সময় প্রাচী ওকে খাওয়াল মার হাতে করা পুডিং। রিমঝিমের গোয়েন্দাগিরির ন্যায্য পারিশ্রমিক।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী


No comments:

Post a Comment