গল্প: রাধারানির আচার: দেবলীনা দে

 

রাধারানির আচার


দেবলীনা দে



মূর্তি নদীর ধারে চাপড়ামারির জঙ্গল সীমান্তে ছোট্ট বন-বস্তি। সেখানে বেশ কিছু নেপালি পরিবারের বাস। তাদের জীবিকা বলতে জঙ্গলের কাঠ কুড়িয়ে বেশ খানিকটা দূরে নাগরাকাটা বা চালসায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা আর পাহাড়ের গায়ে কিছু জমিতে ঝাড়ুর চাষ করে দিনযাপন। শিক্ষার আলো পৌঁছনো তো অনেক দূরের কথা, পেটের খিদে মেটাতে ওষ্ঠাগত। এদের সঙ্গে থাকে এক বিধবা মহিলা রাধা। তার স্বামীর মেয়ের জন্মের দুই মাসের মধ্যে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়। তারপর থেকে রাধা কোনোক্রমে সংসার সামলে রোজগার করার চেষ্টা করছে। এখন মেয়ের বয়স পাঁচ বছর, পড়াশুনায় ভীষণ আগ্রহ। তাই দিনের শেষে রাধা তার মেয়েকে নিয়ে পড়াতে বসে। তবে স্কুলে পড়ানোর মতো সামর্থ তার নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয় বেশ খানিকটা দূরে। তার লাগোয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়। রোজ পায়ে হেঁটে যায় রাধা তার হাতে বানানো আচার নিয়ে। টিফিন-বেলায় ঝাঁকে ঝাঁকে ছেলেমেয়েরা তাকে ঘিরে ধরে আচারের জন্য। ভীষণ সুস্বাদু হাতে বানানো আচার, একবার মুখে দিলে আবার খেতে ইচ্ছে করে। এই হল তার জীবিকা। এছাড়া জঙ্গলের কাঠও জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করে। তবে বন্য জীবজন্তুর ভয় তাকে আঁকড়ে ধরে। তার যে একরত্তি মেয়ে রানি, মা ছাড়া কেউ নেই তার। সেই জন্য বেশি গভীর বনে সে যেতে পারে না।

এমনি করে চলছে মা আর মেয়ের নিত্য জীবন। দিনের শেষে ঘরে ফিরে এসে রাধা যখন মেয়ের হাসিমুখ দেখে তখন তার সমস্ত ক্লান্তি নিমেষে মিলিয়ে যায়। কত প্রতিকূলতা, অভাব রানির সেই ছোট্টবেলার সঙ্গী। তবুও কোনোদিন তার মায়ের কাছে কোনো বায়না করেনি। শুধু বলে, ‘মা, আমি পড়াশুনা শিখে একদিন অনেক বড়ো হব। তখন তোমাকে এত কষ্ট করতেই হবে না।’ এই বলে মাকে জড়িয়ে ধরে।

হঠাৎ একদিন রাধার ভীষণ জ্বর, মাথা তুলতে পারছে না। রাতে সব আচার প্যাকেটে ভরে রাখা তার নিত্যদিনের কাজ। কিন্তু এত অসুস্থ যে সে স্কুলের সামনে গিয়ে বসতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সকালে ঘরে থাকা মুড়ি-জল দুজনে খেয়েছে, কিন্তু দুপুরের খাবার কী খাবে? ভেবেছিল আচার বিক্রি করে যা রোজগার হবে তা দিয়ে বাজার করে ফিরবে। কিন্তু এখন কী উপায়, সেটা ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছে না।

মায়ের এই অবস্থা দেখে রানি বলে উঠল, “মা, তোমার তো খুব জ্বর, গা পুড়ে যাচ্ছে। আমি দৌড়ে ওষুধ-জেঠুর থেকে ওষুধ নিয়ে আসি আর বলব কাল টাকা দিয়ে যাব। তুমি বিশ্রাম করো।”

“কাল!” এই বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রাধা। মনে মনে ভাবল, কাল যদি সুস্থ না হই কী করে উনুন জ্বলবে?

রানি ঘর থেকে বেরিয়ে ওষুধ আনতে ছুটল।

কিছুক্ষণ বাদে ঘরে ফিরে মাকে বলল, “এই নাও ওষুধ। আর তোমার জ্বর শুনে বড়ি-আম্মা রুটি-সবজি দিয়েছে, এটা খেয়ে ওষুধ খেয়ে নাও।”

“রানি, তুই তো একদিনে অনেক বড়ো হয়ে গেলি রে। আয়, আমার সঙ্গে খাবি।”

“ঠিক আছে, আগে তুমি খাও, তারপর আমি খাচ্ছি। আচ্ছা মা, তুমি ওষুধ খেয়ে একটু শরীর ভালো লাগলে কাল আমার সঙ্গে যাবে স্কুলের মাঠে? ওখানে তুমি গাছের নীচে বেদিতে বসে থাকবে, আমি আচার বিক্রি করব। তুমি টাকা গুনে নেবে।”

ওর কথা শুনে রাধা অবাক। এইটুকু বয়সে মেয়ে এত বুদ্ধি, মনে জোর পেল কোত্থেকে! তারপর হালকা হেসে বলল, “তুই তো আছিস। আমার হাত ধরে নিয়ে যাবি, আমি ঠিক পারব।”


ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাড়াহুড়ো করে উঠল রাধা, “এত বেলা হয়েছে, ডাকিসনি কেন? যেতে তো সময় লাগবে। তার আগে ব্যাগ গুছিয়ে নিতে হবে তো।”

তারপর দুজনে পায়ে হেঁটে রওনা দিল। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিল, আবার চলতে শুরু করল। একসময় ঠিক পৌঁছে গেল স্কুলের মাঠে। টিফিনের বেল পড়তে কিছু সময় বাকি।

রানি তার মাকে গাছের তলায় বেদিতে বসিয়ে কল থেকে জল আনতে গেল। কলের কাছে ইস্কুলের প্রাইমারি সেকশন, ক্লাস চলছে। কেউ পড়া বলছে, আবার কেউ বলবে বলে হাত তুলছে। তা দেখে রানি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে ক্লাসের দরজার সামনে এগিয়ে গেল। ক্লাসে অঙ্ক করাচ্ছেন দিদিমণি। সেখানে দাঁড়িয়ে বোর্ডের দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে রানি। এতটাই মন তার সেদিকে, কখন যেন সে প্রায় দরজার ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং বোর্ডে যোগ অঙ্ক করানো দেখে বলেই ফেলল, “আমি পারব দিদিমণি। এর উত্তর সাত হবে।”

ক্লাসের ভেতরে থাকা বাচ্চারা তো ওকে দেখে অবাক। কে এই মেয়েটি? আগে তো কখনো দেখেনি। সবার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। দিদিমণি তাদের চুপ করিয়ে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। এবার ভয় পেয়ে রানি পিছু হটতে লাগল।

“দাঁড়াও! আমি তোমাকে বকব না। কে তুমি? নাম কী তোমার?

এবার একটু ভয় ভাঙল রানির। দাঁড়িয়ে বলল, “আমি রানি। স্কুলের মাঠে আচার বিক্রি করে রাধা, আমার মা। মায়ের খুব জ্বর তো, তাই আমি আজ এসেছি। জল নিতে এসে দেখলাম এখানে সবাই পড়ছে, আমার তাই পড়তে ইচ্ছে হল। আমি এখন যাই দিদিমণি।”

“কেন? তুমি পড়তে চাইলে আর চলে যাচ্ছ যে!”

“আসলে আমার মায়ের তো পয়সা নেই, তাই বাড়িতে আমাকে সন্ধেবেলা পড়ায়। স্কুলে পড়তে অনেক পয়সা লাগে। মা কী করে পড়াবে? সেইজন্য আমি স্কুলে যেতে পারব না। ঘরে পড়ব।”

কথাটা শুনে দিদিমণির বুকের ভিতরটা কেমন হু হু করে উঠল। এতটুকু বাচ্চা, এত বুদ্ধি! টিফিনে ওর মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

এদিকে রানি ফিরছে না দেখে তার মা অস্থির হয়ে উঠছে। এতটা পথ এসেছে, শক্তি পাচ্ছে না। কিন্তু জল নিতে তো এত সময় লাগে না! বিপদে পড়েনি তো? এই ভেবে কলের দিকে তাকাতেই দেখে হাসিমুখে ফিরছে রানি, হাতে একটা বই।

টিফিনের বেল পড়তেই কচিকাঁচাদের ভিড়। এরপর বড়োরাও হাজির। সবাইকে আচার হাতে তুলে দিচ্ছে রানি আর তার মা টাকাপয়সার হিসেব বুঝে-শুনে নিচ্ছে।

খানিক বাদে এক দিদিমণি এদিকে আসতে দেখে রাধা ভয় পেয়ে গেল। ততক্ষণে ভিড় খানিকটা হালকা হয়েছে।

“রাধা, এদিকে একটু শুনবে?”

কথাটা শুনে রাধা মনে মনে ভাবছে, রানি পড়ার জন্য ভুল করে কারো বই নিয়ে চলে আসেনি তো? সেই জন্য কি দিদিমণি ডাকছেন?

“দিদিমণি, আপনি এলেন কেন? খবর দিলেই তো আমিই চলে যেতাম। বলছি যে আমার মেয়ে কি ভুল করেছে কিছু? ওর হাতে বই দেখলাম।”

“রাধা, তোমার মেয়ে এত বুদ্ধিমতী আর তুমি বলেছ পয়সার জন্য পড়াতে পারবে না? এটা তুমি ঠিক করোনি।”

“অপরাধ নেবেন না দিদিমণি, আমি জানি ওর পড়াশুনোয় খুব আগ্রহ, কিন্তু আমি ওকে উঁচু ক্লাসে কীভাবে পড়াব? তখন তো পড়া ছাড়তেও চাইবে না। আমার সামর্থ কতটুকু সেটা তো আপনারা জানেন।”

“রাধা, তুমি এত ভাবছ কেন? তোমার মেয়ের পড়াশুনোয় এত উৎসাহ দেখে সত্যি আমরা অবাক। আর তাছাড়া এখন তো সরকার থেকে ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার জন্য অনেক সুযোগ করে দিয়েছে।”

রাধা সব শুনল। কিন্তু তার মনে যে বড়ো ভয়, ওর মেয়ে পড়া শুরু করল আর মাঝপথে যদি কোনো কারণে পড়াশুনা থমকে যায়, তখন সে কী করবে? মেয়ের স্বপ্নপূরণ হবে সেটা তো সব মা-বাবার ইচ্ছে। কিন্তু আজ তার এই অবস্থা হত না যদি ওর বাবা বেঁচে থাকত। ভগবানের এ কী পরিহাস?

“রানির এখন বয়স কত রাধা?

“ওর বয়স পাঁচ বছর দিদিমণি।”

“ও আচ্ছা। আমাদের স্কুলে তো ছয় বছরের আগে নেওয়া হয় না। তুমি তো রোজ আসো। তাহলে ওকেও মাঝে মাঝে সঙ্গে নিয়ে আসবে। ওর ভালো লাগবে।”

একথা শুনে রানি আনন্দে আত্মহারা। “আমার কোনো অসুবিধে হবে না মা, আমি রোজ তোমার সঙ্গে আচার বিক্রি করতে আসব আর দিদিমণিরা যখন পড়াবেন তখন আমি স্কুলের বারান্দায় বসে পড়া শুনব। তাহলে আমি কিছুটা শিখতে পারব।”

একথা শুনে স্কুলের দিদিমণি রানির গালে আলতো করে আদর করলেন।

রাধা দিদিমণির কথা শুনে রাজি হল। তবে মনের কোণে শঙ্কা কিন্তু রয়েই গেল কী করে মেয়ের ইচ্ছে পূরণ করবে।

সবকথা হয়ে যাওয়ার পর রানি মাকে বলল, “মা, আমি আজ তোমার সঙ্গে এসেছিলাম বলেই তো আমার পড়াশুনার কথা হল। আমি খুব খুশি। এবার চলো ধীরে ধীরে বাড়ি যাই। এবার থেকে তুমি একা নও, তোমার সঙ্গে আমিও হাতে হাতে সাহায্য করতে পারব আর পড়া করতে পারব।”


___

অঙ্কনশিল্পীঃ স্বর্ণদীপ চৌধুরী


No comments:

Post a Comment