গল্প: প্রাণ: মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়


আজ তিতিন আর মিতিনের খুব আনন্দ। ওরা দুজনে হাত ধরাধরি করে সারা বাড়ি ঘুরছে, গান গাইছে আর মা যা বলছে তক্ষুনি করে দিচ্ছে। শুধু ওরাই আনন্দ করছে না, সারা বাড়িটাই খুশিতে ভরে উঠেছে।

আচ্ছা, আগে তোমাদের সঙ্গে তিতিন আর মিতিনের পরিচয় করিয়ে দিই। ওরা দুই বোন। তিতিন দু-মিনিটের বড়ো মিতিনের থেকে। তাই মিতিন দিদি বলে ডাকে তিতিনকে। দুজনেই পড়ে ক্লাস টুতে। থাকে যাদবপুর এইট-বি বাস স্ট্যান্ডের কাছে।

আর আজ কেন খুশি বলো তো সবাই? আজ দিদিন মানে ওদের মায়ের মা একমাস পর নার্সিং হোম থেকে অনেকটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে। অবশ্য দিদিন শুধুই ওদের কাছে মায়ের মা নয়, ওদের বেস্ট ফ্রেন্ড। যা কিছু কথা, গল্প, আলোচনা সব ওরা দিদিনের সঙ্গে করে থাকে। সেই দিদিন আজ বাড়ি ফিরছে। তাই ওদের মনে শুধুই খুশি আর খুশি।

তবে আজ তিতিন আর মিতিনের দিকে কেউ তেমন লক্ষ দিতে পারছে না। অন্যসময় তারা ঠিক সময়মতো খাবার খেল কি না বা কী করছে সবাই খেয়াল রাখে। মা বাড়ি থাকলে মাঝে মাঝেই ডাকে, ‘কই তিতিন, কই মিতিন? একবার শুনে যাও। কী বানিয়েছি দেখো তোমাদের জন্য।’ ওরাও একছুটে হাজির হয়ে যায়। বাড়ি থাকলে মা কোনোদিন কেক, চাউমিন, চকলেট, পাস্তা বানিয়ে সারপ্রাইজ দেয়। ওরা খুব খুশি হয়। আর মা রান্না করে খুব ভালো। সপ্তাহের মাঝের দিনগুলো রিয়াপিসি ওদের সবসময় চোখে চোখে রাখে।

আজ সবাই তো ভীষণ ব্যস্ত। শুধু ওদের বাবা একবার এসে চুপিচুপি বলে গেল, “তোমরা দুষ্টুমি করছ না তো?”

ওরা সুন্দর করে মাথা দুলিয়ে উত্তর দিয়েছে, “না বাবা, আমরা কোনো দুষ্টুমি করছি না। খুব ভালো মেয়ে হয়ে আছি আমরা।”

বাবা দুজনকে আদর করে বলেছে, “তোমাদের আরো একটা কথা বলার জন্য এলাম। শোনো, দিদিন কিন্তু এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়। ডক্টর আঙ্কেল অনেক নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন দিদিনের জন্য। তোমরা কিন্তু দিদিনকে একদম বেশি কথা বলাবে না।”

ওরা দুজনে খুব লক্ষ্মীছানার মতো করে ঘাড় নেড়েছিল।

আসলেই ওরা কিন্তু ভীষণ দস্যি বা খুব টকেটিভ নয়। তবে দিদিনকে কাছে পেলে ওরা একটু ওইরকম মানে ছোট্ট করে দস্যিপনা বা কলকল করে কথা বলে থাকে। তাই বাবাকে সাবধান করতেই হল ওদের।

ওরা জানে বাবা খুব চিন্তিত দিদিনের ব্যাপারে। সেদিনের কথা এখনো মনে পড়লে ওদের খুব কান্না পায়। সেদিন ওরা খুব কষ্ট পেয়েছিল। শুধু ওরা নয়, মা, বাবা, হরিদাদু সবাই। কী একটা যেন উৎসব ছিল। ওরা সবাই, মানে মা, বাবা, তিতিন আর মিতিন খুব সকালবেলা দিদিনের বাড়ি পৌঁছে গিয়েছিল। ওরা দু-বোন খুব সেজেছিল। মাও একটা নতুন শাড়ি পরেছিল। বাবা আবার সেদিন পাঞ্জাবি পরেছিল। বাবাকে একদম অন্যরকম দেখতে লাগছিল। যাবার পথে বাবা একটা বড়ো হাঁড়িতে রসগোল্লা আর অনেক আম কিনেছিল।

দিদিনের বাড়ি পৌঁছতেই সেদিন দিদিন সবার আগে বাবাকে হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেল। মা আর ওরা ওদের পিছুপিছু গেল। তারপর বড়ো ঘরে, মানে আগে যেখানে দাদুন থাকত, সেই ঘরের মেঝেতে আসন পেতে বাবাকে বসাল। বাবার মাথায় দিদিন হাত রেখে বলল, “তবু তুমি আর সুমি কাছে আছ বলে এই দিনটা আমি একটু হলেও পূরণ করতে পারি। প্রমি আর সুব্রত এতটাই দূরে থাকে, কোনোবারেই ওরা আসতে পারে না।”

প্রমি আর সুব্রত কে জানো? তিতিন আর মিতিনের মিম আর মশাই। এই দ্যাখো, মিম আবার কে বুঝতে পারলে না তো তোমরা? মিম হলো ওদের মায়ের বোন, মানে দিদিনের আরেক মেয়ে। প্রথমে বাবার হাতে হলুদ সুতো বেঁধে দিল দিদিন। তারপর হাতে ফলের থালাটা দিল। তারপর পাখার বাতাস করেছে কি করেনি, ধপাস করে দিদিন মাটিতে পড়ে গেল। ব্যস, গোটা বাড়িতে হইচই, কান্নাকাটি। তিতিন আর মিতিনও কেঁদে উঠেছিল।

তারপর বাবা শুধু ফোন আর ফোন... কত ফোন করল। অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেল। দিদিনকে নিয়ে সবাই ছুটল নার্সিং হোমে। শুধু তিতিন আর মিতিন হরিদাদুর কাছে বাড়িতে থেকে গেল।

হরিদাদু খুব কান্নাকাটি করছিল। তিতিন আর মিতিনের খুব কান্না পেলেও ওরা হরিদাদুকে আদর করে বলেছিল, “দিদিন খুব তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে, তুমি দেখো হরিদাদু।”

হরিদাদুও ওদের বলেছিল, “তোমাদের কথাই যেন ঠিক হয়।”

তবে ওরাও কেঁদেছিল। সবার সামনে নয়। দিদিনের সৃষ্টি করা জীবন বা প্রাণের কাছে। ওরা প্রমিস করেছিল যে ওরাও দিদিনের মতো আরো প্রাণ সৃষ্টি করবে।


দিদিন বাড়ি আসতে সবাই হইহই করে উঠেছিল। মিম গিয়ে দিদিনকে জড়িয়ে ধরেছিল। আসলে মিম তো বিদেশে থাকে, খবর পেলেও আগে আসতে পারেনি। আজ সকালেই এসে পৌঁছেছে। দিদিন শুধু মিমের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।

দিদিনকে সবাই সবার মতো করে যত্নআত্তি করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজেরা খেতে গেল। তিতিন আর মিতিনের খাওয়া আগেই হয়ে গিয়েছিল। আর ওরা এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। বাড়ি ফিরে দিদিন শুধু ওদের দিকে তাকিয়ে ঠিক আগের মতো করে চোখটা একবার বুজে নিয়ে হেসেছিল। তাতেই ওরা বুঝে নিয়েছিল, বাবা যাই বলুক না কেন, দিদিন এক্কেবারে ফিট।

এবার নিশ্চিন্তে দুজনে পায়ে পায়ে দিদিনের বিছানার সামনে এসে দাঁড়াল। ওদের মনে হল, দিদিন যেন জানত ওরা এখন আসবে। আস্তে করে জিজ্ঞাসা করল, “কেমন আছ তোমরা? পড়াশোনা মন দিয়ে করছ তো?”

“হ্যাঁ গো দিদিন, আমরা মন দিয়ে পড়াশনা করছি। শুধু তোমার জন্য আমাদের খুব কষ্ট হত।” একসঙ্গে দুজনে বলে।

“সেটা তো হবেই। আমি তোমাদের দিদিন আর তোমরা আমার দিদিভাই।”

“তুমি এখন একদম ঠিক হয়ে গেছ, তাই তো দিদিন?” মিতিন বলে।

“একদম ঠিক হয়ে গেছি। শুধু একটু দুর্বল। রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”

খুশিতে তিতিন আর মিতিন হাততালি দিয়ে ওঠে।

“কিন্তু একটা কথা বলো তো দিদিভাইরা, প্রাণের সংখ্যা কি বেড়েছে?”

ওরা কথা না বলে বাইরের ব্যালকনিতে চলে গিয়ে একটা একটা করে প্রাণ হাতে নিয়ে দিদিনের ঘরের টি-টেবিলে সাজিয়ে দেয়।

দিদিনের চোখে আনন্দের জল। তিতিন আর মিতিন তাদের দিদিনকে জড়িয়ে বুকে মুখ গুঁজে দিয়েছে। আর টেবিলের ওপর প্রাণেরা তাদের কচি সবুজ পাতা দুলিয়ে ওদের ভালোবাসার গন্ধ নিতে নিতে আগামী পৃথিবীকে আরো প্রাণদানের ব্রত নিচ্ছে।


___

অঙ্কনশিল্পীঃ উপাসনা কর্মকার


No comments:

Post a Comment