গল্প: স্বপ্নের আড়ালে: অনুবাদ: শ্যামাপ্রসাদ সরকার

স্বপ্নের আড়ালে


(আগাথা ক্রিস্টি রচিত ‘The Dream’ অবলম্বনে)

ভাষান্তর: শ্যামাপ্রসাদ সরকার



(এক)


গতকাল বিকেলের ডাকে আসা চিঠিটায় যে ঠিকানা দেওয়া আছে, ঠিক সেইখানে নির্দিষ্ট  সময়ে পোয়্যারো এসে পৌঁছল। এলাকাটার সঙ্গে বাড়ির মালিকের অবস্থানটা মানানসই নয় একদম। প্রাসাদোপম নর্থওয়ে হাউসটা পুরোনো লন্ডনের একধারেই বলা যেতে পারে। আশেপাশে থাকার মধ্যে রয়েছে একটা কারখানার উঁচু দেওয়াল আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটা মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাটবাড়ি। একসময় হাউসটার জৌলুস যে ছিল তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবে কালের প্রভাবে তার সেই মসৃণ চাকচিক্যটার অভাব রয়েছে তা বোঝা দায়। বাড়িটার বর্তমান মালিক ধনকুবের বেনেডিক্ট ফার্লে। প্রৌঢ় ধনকুবেরের শীর্ণ দেহের মধ্যে যে-দুটো জিনিস কারো নজর এড়ায় না তা হল তাঁর খাড়া নাক আর তার পিছনে ঈগলের মতো দুটো অন্তর্ভেদী চোখ। মোটের ওপর লোকে তাঁকে এড়িয়েই চলে। তবে নিতান্ত কৃপাপ্রার্থী বা উমেদার যে দু-একজন আসে না তাও ঠিক নয়। আসল কথা হল, অতি বড়ো মোসাহেবও  স্যার বেনেডিক্টকে ঠিক দাতার অভিধা দিতে সংকোচ বোধ করবেই। 


***


অ্যাপয়েন্টমেন্টে আসার আগে গতরাত্রে যেটুকু হোমওয়ার্ক সারতে পেরেছে পোয়্যারো, তা মোটামুটি হল, ভদ্রলোক প্রচুর মিলিয়ন পাউন্ডের মালিক, অনেক ক’টা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির চেয়ারম্যান, আলসারের ব্যারামে ভোগেন, মেজাজ খিটখিটে (ওটা ধনীদের বৈশিষ্ট্য বটে), বিড়ালজাতীয় প্রাণী পছন্দ করেন না, রাত্রে বাঁধাকপির স্যুপ আর ক্যাভিয়ার খান আর পরনের সবুজ ড্রেসিং গাউনটা গত আটাশ বছরে বদলানোর প্রয়োজন বোধ করেননি।

দরজায় টোকা মারার আগে প্যান্টের ডান পকেট থেকে চিঠিটা বের করে একবার চোখ বুলিয়ে নিল পোয়্যারো।

‘নর্থওয়ে হাউস, ডব্লিউ ৮

ম্যসিয়েঁ এরকুল পোয়্যারো

মহাশয়,

স্যার বেনেডিক্ট ফার্লে একটি একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে আপনার পরামর্শ গ্রহণে ইচ্ছুক। আপনি রাজি থাকলে আগামী বৃহস্পতিবার ঠিক রাত সাড়ে ন’টায় উক্ত ঠিকানায় এসে দেখা করবেন।

বিষয়টি গোপনীয় রাখলে স্যার বেনেডিক্ট আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ থাকবেন।


ইতি,

আপনার বিশ্বস্ত

হিউগো কনওয়ার্দি

(ব্যক্তিগত সহায়ক)


পুনশ্চ: অনুগ্রহ করে চিঠিটি সঙ্গে আনবেন।’


পকেট ঘড়িতে সময় এখন ন’টা চৌত্রিশ। অর্থাৎ ঠিক সময়ে এসে পড়েছে ধরাই যায়।

বাটলারটি অত্যন্ত বিনীতভাবে চিঠিটি দেখতে চাইল। মিনিট দুয়েকের মধ্যে সে পোয়্যারোকে স্যার বেনেডিক্টের ঘরের সামনে নিয়ে এল। দরজায় ঠিক বিশেষ কায়দায় দুটি টোকা দিল বাটলারটি। এইরকম ধনকুবেরের বাড়িতে সাধারণত এটিকেট নিয়ে বাড়াবাড়ি থাকলেও এ ব্যাপারটা বিসদৃশ ঠেকল। ও-প্রান্ত থেকে আওয়াজ আসার আগে সে নিজেই ফিসফিস করে জানাল, এমনটাই মালিকের হুকুম।

কিছুক্ষণ পরে ভিতরে আসার আহ্বান ভেসে এল। ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। অথচ একটা তীব্র বাতির টেবিল ল্যাম্প দরজার দিকে ঘোরানো বলে ঢুকতেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। গৃহকর্তাটি যে বড়োই অদ্ভুত স্বভাবের তা আর বলে বোঝাতে হয় না। শীর্ণ দেহের মানুষটির গায়ে সেই প্রাচীন ড্রেসিং গাউনটি চাপানো, আর রক্তজল করে চাহনিটা একটা মোটা ফ্রেমের ভারী কাচের আড়ালে লুকোনো। পোয়্যারোর এই চশমার ব্যাপারটা জানা ছিল না।

খসখসে শীতল কণ্ঠে স্যার বেনেডিক্ট বললেন, “আপনার নামই তবে এরকুল পোয়্যারো? চিঠিটা সঙ্গে আছে তো?”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।” বলে অভিবাদন জানিয়ে বাঁ পকেট থেকে কাগজটা বের করে তাঁর দিকে এগিয়ে দেয় পোয়্যারো।

তীব্র আলোয় এখনো চোখ ধাঁধিয়ে আছে বলে স্যার বেনেডিক্টকে আসলে পুরোপুরি ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। চিঠিটা পোয়্যারোর হাতে দেখে নিশ্চিন্ত হলেন বৃদ্ধ। এতক্ষণে বললেন, “বসো।” গলায় সৌজন্যের বাহ্যিক আড়ম্বরের কোনোরকমের বালাই ছাড়াই। “তাহলে তুমিই সেই বিখ্যাত গোয়েন্দা! এরকুল পোয়্যারো!”

“ম্যসিয়েঁ, আমিই সেই। তবে বিখ্যাত বোধ হয় অতটা নই এখনো।” যথাসম্ভব বিনীত গলায় পোয়্যারো উত্তর দেয়।

“আমিই কনওয়ার্দিকে চিঠিটা লিখতে বলি একটা বিশেষ প্রয়োজন আছে বলেই। এমনিতে দরাদরি করে সময় নষ্ট আমি করি না। কাজেই পারিশ্রমিক কত তা জিজ্ঞাসাও করব না। কাজ হয়ে গেলে চেক দিয়ে দেব। অঙ্কটা তুমিই বসিয়ে নিও নিজে।”

পোয়্যারো ততোধিক বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দেয়, “আপনার কথাটা আগে আমার জানা দরকার। পারিশ্রমিক আমি কাজের গুরুত্বের ওপর নিয়ে থাকি।”

বৃদ্ধ বেনেডিক্ট এবার বোধ হয় একটু খুশি হলেন। “হ্যাঁ, সেই অর্থপূর্ণ কথাটার জন্যই তো  ডাকা। যা তোমার পক্ষেও অর্থকরীও বটে! ব্যাপারটা ব্যক্তিগত, তাই গোপনীয়তাটুকু আশা করতে পারি তো?”

পোয়্যারো এর আগে অনেক ধনীকে দেখেছেন। তাঁদের অদ্ভুত আচার-ব্যবহার, খেয়াল, মেজাজ। অথচ আলোর পেছনে বসে থাকা মানুষটির আচরণে পোয়্যারো সেই বড়োলোকিয়ানার ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাচ্ছিল না। স্যার বেনেডিক্টের কথার ধরন থেকে পরনের ড্রেসিং গাউন, এমনকি উচ্চারণ—সবকিছুর মধ্যে একটা নাটুকে ভাবই বরং বেশি করে স্পষ্ট হচ্ছিল।

“আচ্ছা, আপনি স্বপ্ন সম্বন্ধে কী কী জানেন ম্যসিয়েঁ পোয়্যারো?”

পোয়্যারোর ভুরু দুটো কুঁচকে উঠল এই আকস্মিক প্রশ্নটায়। ভদ্রলোকের আর সবকিছুর মতো এই খাপছাড়া প্রশ্নটাও তাকে এইবারে অবাক করেছে।

“স্যার, আপনি ‘বুক অফ ড্রিমস’ বইটার কথা জানেন নিশ্চয়ই।” ঠান্ডা গলাতেই উত্তরটা এল পোয়্যারোর দিক থেকে। “অথবা হার্লে স্ট্রিটের কোনো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে একবার কথা বললে মনে হয় এর ঠিকঠাক উত্তর পাবেন।”

“শোনো ছোকরা! আমি দুটোই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু…”

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ফার্লে আবার নীচু গলায় কথা বলতে শুরু করলেন ক্রমশ  আস্তে আস্তে, তারপর আবার জোর গলায়। “ওই একই স্বপ্ন, রাতের পর রাত! প্রত্যেক রাতে সেই এক দৃশ্য। আমি আমার পাশের ঘরটায় বসে আছি, নিজের টেবিলে। কিছু কাজ করছি। হঠাৎ আমার নজর পড়ছে ঘড়ির দিকে। দেখছি, তখন সময় ঠিক তিনটে বেজে আটাশ। আর তখনই, ঠিক তক্ষুনি আমার মনে হচ্ছে, আমাকে কাজটা করতে হবে। করতেই হবে। আমার শরীর বিদ্রোহ করে, মন-হাত সব অসাড় হয়ে যায় কাজটার কথা ভাবলেই। কিন্তু তবু কাজটা…”

“কী কাজ?” শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে পোয়্যারো, “কী এমন করতে হয় আপনাকে?”

“বেলা তিনটে বেজে আটাশ মিনিটে,” ভাঙা গলায় জোর ফিরিয়ে আনেন ফার্লে, “আমি আমার ডেস্কের ডানদিকের দ্বিতীয় ড্রয়ারটা খুলি। সেখান থেকে আমার রিভলভারটা বের করি। তাতে গুলি ভরে ধীরপায়ে জানালার কাছটাতে গিয়ে দাঁড়াই, আর তারপর… তারপর…”

“তারপর?”

“আমি নিজেকে সটান গুলি করি।” ফিসফিসিয়ে বলেন ফার্লে।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর পোয়্যারো জিজ্ঞেস করে, “এটাই কি আপনার সেই স্বপ্ন?”

“হ্যাঁ।”

“রোজ রাতে এটাই দেখেন আপনি?”

“হ্যাঁ।”

“আপনি নিজের দিকে গুলি চালানোর পর কী হয়?”

“আমার ঘুম ভেঙে যায়। তারপর মাথার ভিতরটা তোলপাড় করে ওঠে। একদণ্ড শান্তি নেই আমার! এর কিছু সুরাহা করতে পারবে?”

“আপনি কি সত্যিই ওই ড্রয়ারটাতে একটা রিভলভার রাখেন?”

“না, মানে হ্যাঁ।”

“কেন?”

“আমার মতো লোকেদের শত্রু নেহাত কম নেই ম্যসিয়েঁ পোয়্যারো।” ধৈর্যচ্যুত কণ্ঠে বলেন ফার্লে, “আমাকে আত্মরক্ষার জন্য এসব রাখতেই হয়।”

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল পোয়্যারো। তারপর নীচু স্বরে জিজ্ঞাসা করে, “আমার কাছ থেকে আপনি ঠিক কী জানতে চাইছেন?”

“আমি এখনো অবধি তিনজন ডাক্তারকে কনসাল্ট করেছি। প্রথমজন বয়স্ক। তিনি বললেন, আমার খাওয়াদাওয়া নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। দ্বিতীয়জন অল্পবয়সী এবং আধুনিক চিন্তাভাবনায় বিশ্বাসী। তাঁর বক্তব্য, আমার জীবনে ওই দুপুর তিনটে বেজে আটাশে এমন কিছু একটা হয়েছিল, যেটা ভোলার জন্য আমি বদ্ধপরিকর। ওই সময়ে নিজেকে ধ্বংস করার প্রতীকী পদ্ধতিতে আমি ব্যাপারটা স্থায়ীভাবে ভুলতে চাই।”

“আর তৃতীয়জন?”

ফার্লের গলা রাগে তীব্র, তিরিক্ষে হয়ে ওঠে এবার। “তৃতীয়জন… তিনিও কমবয়সী। কিন্তু তাঁর আইডিয়া এক্কেবারে গাঁজাখুরি। গর্দভ! রাস্কেল একটা। তাঁর বক্তব্য, আমি নিজের জীবন নিয়ে, নিজেকে নিয়ে এতটাই তিতিবিরক্ত ও ক্লান্ত যে আমি সবকিছু শেষ করে দিতে চাইছি। অন্য সময় আমার মনের জোরের দাপটে এই ভাবনাগুলো সামনে আসতে পারে না। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়লে সেই অবরোধগুলো থাকে না। তাই তখন ঘুমের মধ্যে আমি এমন একটা কাজ করি যেটা নাকি আমি সত্যিই করতে চাই!”

“বেশ।” পোয়্যারো গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ায়। “তার মানে, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী আপনি আত্মহত্যা করতেই চান?”

“ঠিক তাই।” চেঁচিয়ে ওঠেন ফার্লে। “এর চেয়ে বড়ো মিথ্যে রসিকতা আর কিছু হতে পারে না ম্যসিয়েঁ পোয়্যারো! আমার সব আছে। এই জীবন আমি হঠাৎ শেষ করে দিতে চাইব কেন?”

পোয়্যারো চুপ করে থাকে। কিন্তু সামনে বসা মানুষটির গলার স্বর, অভিব্যক্তি এসব যেন  অন্য কিছুর ইশারা করছিল। শান্ত গলায় সে বলে, “কিন্তু এসবে আমার কী ভূমিকা? এখনো তো কিছুই সেরকম কোনো ঘটনা বা ইঙ্গিত, মানে মাফ করবেন, এসময়ে একজন গোয়েন্দার ঠিক কী করণীয় হতে পারে?”

স্যার বেনেডিক্ট হঠাৎ শান্ত হয়ে যান। টেবিলে আঙুলটা বাজাতে বাজাতে তিনি বলেন, “আরেকটা সম্ভাবনাও আছে। আর যদি সেটাই সত্যি হয়, তাহলে তুমিই সেটা ভালো বলতে পারবে। এত কেস নিয়ে নাড়াচাড়া করেছ এতদিনে, নিশ্চয় জানবে ব্যাপারটা।”

“সেটা কী জিনিস?”

“হিপনোটিজম।” যেন একটু বিরক্ত হন ফার্লে। “সম্মোহনের মাধ্যমে যদি আমার মাথায় এই, এই আত্মহত্যার ব্যাপারটা গেঁথে দিয়ে আমার কোনো শত্রু আমাকে সেই পথেই চালিত করতে চায়? এভাবেও তো আমাকে খুন করা যায়, তাই না?”

“তাই যদি হয়,” পোয়্যারো একটু হেসে বলে, “তাহলে একজন মনোবিদই একমাত্র ঠিকঠাক পরামর্শ দিতে পারবেন আপনাকে।”

“তুমি এমন কোনো কেস দেখোনি তোমার জীবনে?”

“না।”

“কিন্তু এমন হতে তো পারে!”

“কী হতে পারে আর না পারে সেটা… কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে।” পোয়্যারো ফার্লেকে খুঁটিয়ে দেখে। বলে, “ধরে নিই তাই যদি হয় তবে আপনাকে কে খুন করতে পারে বলে আপনার মনে হয়? আর তার মোটিভটাও তো নিশ্চিত হওয়া দরকার।”

“কেউ না!”

“তাহলে আপনার এমনটা মনে হল কেন?”

“আমি জানতে চাইছিলাম এমনটা হতে পারে কি না।”

“না। পারে না।” পোয়্যারো দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দেয়। “আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এটা হওয়া অসম্ভব, যদি না আপনি স্বেচ্ছায় কারো দ্বারা সম্মোহিত হয়ে এসব উলটোপালটা ভাবেন।”

“কী যা-তা বলছ?” রেগে ওঠেন ফার্লে, “আমি এসব জিনিসে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নই।”

“ব্যস, তাহলে তো হয়েই গেল।” পোয়্যারো বলে ওঠে, “তবে আপনার স্বপ্নটা বেশ ইন্টারেস্টিং এটা মানছি। আমি কি একবার অকুস্থলটা দেখতে পারি? মানে সেই টেবিল, সেই ড্রয়ার, সেই রিভলভার—ওগুলো একবার দেখা যেতে পারে?”

“অবশ্যই। এই পাশের ঘরেই তো।”

ড্রেসিং গাউনটা ভালোভাবে জড়িয়ে চেয়ার ছেড়ে প্রায় উঠে পড়েছিলেন ফার্লে। কিন্তু হঠাৎ করে একটা কিছু মনে পড়ল তাঁর। ধপ করে আবার চেয়ারটায় বসে পড়লেন তিনি।

“না।” স্যার বেনেডিক্ট হতাশ গলায় বললেন, “নতুন করে আর তোমার ওখানে দেখার কিচ্ছুটি নেই। যা বলার, তার সবটাই আমি সবটাই বলেছি।”

“কিন্তু আমি নিজে একবার না দেখলে কীভাবে…”

“তার আর কোনো দরকার নেই।” এবার ঝাঁঝিয়ে ওঠেন ফার্লে, “তোমার মতামত শুনলাম। যা বোঝার আমি বুঝেছি। এর বেশি সময় তোমার আর নষ্ট করতে হবে না। অফিসে বিলটা আমাকে পাঠিয়ে দেবে, ব্যস।”

“আমি দুঃখিত।” উঠে দাঁড়িয়ে বলে পোয়্যারো, “কিন্তু আপনাকে সাহায্য করতে পারলাম না।”

“ওই চিঠিটা একবার দাও।” হঠাৎ হাত বাড়িয়ে দেন ফার্লে।

“চিঠি… মানে যেটা আপনার সেক্রেটারি আমাকে লিখেছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

পোয়্যারোর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠল। তবে পেশাগত ভদ্রতার কারণে নিজেকে সামলে পকেট হাতড়ে ভাঁজ করা কাগজটা এগিয়ে দিল। কাগজটা নিয়ে তাতে একবার চোখ বুলিয়ে সেটা পাশের টেবিলে রেখে দিলেন ফার্লে।

“তুমি এবার আসতে পারো। আমার ডিনারের সময় হয়ে গেছে।”

কিছুটা অস্বস্তি নিয়েই ঘরের দরজার দিকে যেতে যেতে দরজার হাতলে হাত রেখেই পোয়্যারোর ব্যাপারটা যেন মনে পড়ল হঠাৎ।

“আ-আমি খুব খুব লজ্জিত।” পোয়্যারো বলল, “বেখেয়ালে আমি আপনাকে একটা অন্য কাগজ দিয়ে ফেলেছি। আসলে চিঠিটা আমার বাঁ পকেটে আছে। তার বদলে আমি আপনাকে ডান পকেটের কাগজটা দিয়ে ফেলেছি। আপনার হাতের কাগজটা আসলে একটা ধোপাবাড়ির রসিদ।”

“তার মানে?” চেয়ারে বসা মানুষটি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। “তোমার তো আস্পর্ধা কম নয় হে! আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছ নাকি?”

“আজ্ঞে না।” সবিনয়ে উত্তর দেয় পোয়্যারো, “যে কাগজটা আমি আপনাকে দিয়েছিলাম সেটা আমার ধোপাবাড়ির। তারা আমার স্যুটটা বরবাদ করার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে ওটা লিখেছিল। আপনার সেক্রেটারির চিঠিটা এ-এই যে এটা।” বাঁ পকেট থেকে কাগজটা বের করে দেয় সে।

“কাকে কী দিচ্ছ সেটুকুও দেখার সময় নেই?” রেগে গজগজ করেন স্যার বেনেডিক্ট ফার্লে।

পোয়্যারো আরো একবার ক্ষমা চেয়ে অবশেষে বাইরে বেরিয়ে আসে।

নীচে বাটলারের কাছ থেকে নিজের টুপি ও ছড়ি উদ্ধার করে নিজের আস্তানার দিকে হাঁটতে থাকে পোয়্যারো। আজকের এই সাক্ষাৎকার, আর তার সুবাদে শোনা গল্পের দুর্বোধ্যতা নিয়ে একটা অস্বস্তি তবুও মনে থেকেই যায়।


(দুই)


এরপর কেটে গেছে সাতটা দিন। ডক্টর জন স্টিলিংফ্লিট, এম.ডি-র ফোনটা এল ঠিক দিবানিদ্রাটির শেষ পর্যায়ে।

“ম্যসিয়েঁ পোয়্যারো কথা বলছেন? আমি নর্থওয়ে হাউজ থেকে বলছি। স্যার বেনেডিক্ট ফার্লের বাড়ি।”

কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গিয়ে পোয়্যারো বলে, “বলুন ডক্টর।”

“স্যার বেনেডিক্ট মারা গেছেন। আজ বিকেলে আত্মহত্যা করেছেন ভদ্রলোক।”

“তাহলে…”

“স্যার বেনেডিক্টের অফিস ঘরের কাগজপত্রের মধ্যে আপনার সঙ্গে ওঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট বিষয়ক একটা চিঠি পেয়েছে পুলিশ। পরিবারের ডাক্তার তথা বন্ধু হিসেবে আমিও সেটা দেখেছি। পুলিশ এসব ক্ষেত্রে একটু ধীরে চলার নীতি নেয়, জানেনই তো। কোটিপতির আত্মহত্যা, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনি হয়তো এই ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করতে পারেন।”

“আমি এখুনি আসছি।” সংক্ষেপে এটুকু বলে পোয়্যারো ঝটপট তৈরি হয়ে ট্যাক্সি নিয়ে ছুটে যায় গন্তব্যের দিকে।


ঘণ্টা খানেক পর নর্থওয়ে হাউজের স্টাডিতে বসে চিন্তাজাল থেকে আসল সত্যিটাকে খুঁজতে চেষ্টা করছিল পোয়্যারো। ঘরের মধ্যে আর ছিল পাঁচজন ব্যক্তি। গম্ভীর, মিলিটারি চলনবলনের অধিকারী ইন্সপেক্টর বার্নেট পোয়্যারোর পূর্বপরিচিত। বছর ত্রিশেক বয়সের ছটফটে ডক্টর স্টিলিংফ্লিট। সদ্য স্বামীহারা, বেনেডিক্ট ফার্লেরর চেয়ে বয়সে অনেকটাই ছোটো, দৃঢ় চোয়াল আর গভীর কালো চোখের আড়ালে মনের ভাব লুকিয়ে রাখা সুন্দরী মিসেস ফার্লে।

এ বাড়িতে আজ প্রথমবার বেনেডিক্ট ফার্লের মেয়ে জোয়ানা ফার্লেকে দেখে তার মন বলে উঠল, যে সে স্যার বেনেডিক্টের চিবুক আর নাকই শুধু নয়, তাঁর বাস্তববুদ্ধিও উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। ঘরের মধ্যে আর ছিল স্যার বেনেডিক্টের সেই সেক্রেটারি—তরুণ, শান্ত, সুদর্শন হিউগো কর্নওয়ার্দি।

পরিচয়ের পালা শেষ হওয়ার পর পোয়্যারো স্যার বেনেডিক্ট ফার্লের সঙ্গে তার দেখা হওয়া এবং ফার্লের ওই স্বপ্নের ব্যাপারটা সবাইকে বলল।

“কী অদ্ভুত!” বললেন ইন্সপেক্টর। “এই স্বপ্নের ব্যাপারটা নিয়ে আপনি কিছু জানতেন মিসেস ফার্লে?”

“জানতাম।” বললেন মিসেস ফার্লে। “উনি এই ব্যাপারটা নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তা করছিলেন কিছুদিন ধরেই। আমি বলেছিলাম উনি যেন ডক্টর স্টিলিংফ্লিটের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলেন।”

“কই, না! আমার সঙ্গে তো এই নিয়ে উনি কোনো কথা বলেননি।” বলে উঠলেন তরুণ ডাক্তারটি। “ম্যসিয়েঁ পোয়্যারোর কথা শুনে মনে হচ্ছে, মিস্টার ফার্লে সরাসরি হার্লে স্ট্রিটের ডাক্তারদের পরামর্শ চেয়েছিলেন।”

“ডাক্তাররা ওঁকে যা বলেছিলেন,” পোয়্যারো সামনে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞাসা করে, “সেই বিষয়ে আপনার কী বক্তব্য ডক্টর?”

“একটা কথা এখানে মাথায় রাখা দরকার।” স্টিলিংফ্লিটের মুখে অস্বস্তি প্রকট হয়। “মিস্টার ফার্লেকে যা বলা হয়েছিল, আর উনি আপনাকে যা বলেছিলেন, তা কিন্তু এক নাও হতে পারে। আপনাকে যা বলা হয়েছিল, সেগুলো… সাধারণ মানুষের বর্ণনা। ডাক্তাররা বা বিশেষজ্ঞরা কিন্তু সাধারণত ঠিক এইরকম ব্যাখ্যা দেবেন না।”

“হুঁ।” চিন্তিতভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল পোয়্যারো। “উনি ঠিক কোন কোন ডাক্তারদেরর সঙ্গে কথা বলেছিলেন, সে ব্যাপারে কেউ আলোকপাত করতে পারবেন?”

মিসেস ফার্লে ‘না’ বোঝালেন। জোয়ানা ফার্লে স্পষ্ট গলায় বলেই ফেলল, “উনি কোনো ডাক্তারের পরামর্শ চেয়েছিলেন, এমনটাই জানতাম না। এমনকি এই স্বপ্নের ব্যাপারেও বাবা আমায় কখনো বলেননি।”

পোয়্যারো এবার হিউগোর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই তৎক্ষণাৎ উত্তর এল, “আজ্ঞে না। স্যারের ডিকটেশন অনুযায়ী আমি আপনাকে একটা চিঠি লিখেছিলাম ঠিকই। তবে আমার ধারণা ছিল, উনি আপনাকে দিয়ে ব্যাবসার ব্যাপারে কোনো তদন্ত করাতে চাইছেন।”

পোয়্যারো কিছুক্ষণ চুপ করে জানালা দিয়ে চেয়ে রইল। তারপর ইন্সপেক্টর বার্নেটের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এই আত্মহত্যার ব্যাপারটা ঠিক কীভাবে আবিষ্কৃত হল, সেটা একটু বলবেন?”

“রোজ দুপুরে স্যার বেনেডিক্ট একা নিজের ঘরে বসে কাজের সঙ্গে জড়িত কাগজপত্র দেখতেন। সেদিনও তাই করছিলেন তিনি। দুজন সাংবাদিক সোয়া তিনটেয় তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলেন। শুনেছি, এটা নাকি সাংঘাতিক বিরল ঘটনা, মোটামুটি বছর পাঁচেকে একবার করে হয়! তিনটে কুড়ি নাগাদ স্যার বেনেডিক্টকে কিছু কাগজ দিতে আসে একজন। দরজা খুলে কাগজ নিতে গিয়ে উলটোদিকে বসা দুই সাংবাদিককে দেখে স্যার বেনেডিক্ট বলেন, ‘আমাকে আর একটু সময় দিতে হবে আপনাদের। এই কাগজগুলো দেখা খুবই জরুরি।’ তাতে অবশ্য সাংবাদিকেরা কোনো আপত্তি করেননি।

“স্যার বেনেডিক্ট এরপর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেন। তারপর তাঁকে আর কেউ জীবিত দেখেনি।”

“মৃতদেহ কে প্রথম আবিষ্কার করেন?”

“ওই ধরুন বিকেল চারটের একটু পরে মিস্টার কর্নওয়ার্দি তাঁর ঘর থেকে, মানে ঠিক পাশের ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসেন। কয়েকটা চিঠিতে স্যার বেনেডিক্টকে দিয়ে সই করানো দরকার ছিল। দুই সাংবাদিককে তখনো অপেক্ষা করতে দেখে কর্নওয়ার্দি ঠিক করেন, তিনি  সই নেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে এই সাক্ষাৎকারের ব্যাপারটাও একবার মনে করিয়ে দেবেন। ঘরে ঢুকে কর্নওয়ার্দি একটু অবাকই হয়ে গেছিলেন, কারণ স্যার বেনেডিক্টকে তিনি প্রথমে কোথাও দেখতে পাননি। তারপর টেবিলের পেছন থেকে বেরিয়ে থাকা জুতো পরা একটা পা দেখে তিনি সেদিকে গিয়ে তাঁকে মৃত অবস্থায় আর হাতের কাছে পড়ে থাকা একটা রিভলভার দেখতে পান।”

“তারপর?”

“কর্নওয়ার্দি প্রথমে ডক্টর স্টিলিংফ্লিটকে, আর তারপর পুলিশকে খবর দেন।”

“কেউ কিছু শোনেনি?”

“ওই ঘরের পেছনেই তো কারখানাটার দেওয়াল। তার সঙ্গে দু-পাশের রাস্তাতেই গাড়ির আওয়াজ খুব বেশি। এত আওয়াজে গুলির শব্দটা চাপা পড়ে গেছিল।”

“মৃত্যুর সময়টা কখন বলে ধরছেন?”

“আমি এখানে এসেই মৃতদেহটি পরীক্ষা করেছিলাম।” বলেন ডক্টর স্টিলিংফ্লিট, “তখন চারটে বত্রিশ। আমার হিসেব বলছে, উনি অন্তত তার ঘণ্টা খানেক আগে মারা গেছিলেন।”

“তাহলে আপনার হিসেবমতো স্যার বেনেডিক্টের মৃত্যুর সময়টা তাঁর আমাকে বলা ‘আত্মহত্যা’-র সময়ের খুব কাছাকাছি। তাই না?” পোয়্যারোর মুখে আঁধার ঘনাল। “রিভলভারটা থেকে কী জানা গেল?”

“ওটা ওঁর ডেস্কের ডানদিকের দ্বিতীয় ড্রয়ারেই থাকত, ঠিক যেমনটা উনি আপনাকে বলেছিলেন। আর তাতে শুধু ওঁরই হাতের ছাপ পাওয়া গেছে।”

“তাহলে এই মৃত্যুটাকে আত্মহত্যাই ভাবতে হচ্ছে।”

“মাত্র একটা জিনিস না পেলে আমাদের অন্য কিচ্ছু ভাবতে হত না মিস্টার পোয়্যারো।” ইন্সপেক্টর বার্নেটের মুখে একটা ক্লিষ্ট হাসি ফুটে উঠল।

“সেটা কী?”

“আপনাকে লেখা চিঠিটা।”

“হুঁ।” পোয়্যারোর ঠোঁটটাও চিন্তায় কুঁচকে ওঠে। “অর্থাৎ যেখানে এরকুল পোয়্যারো, সেখানেই খুন?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।” বলেন ইন্সপেক্টর বার্নেট, “তবে এখন তো আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে ব্যাপারটা নিয়ে আর মাথা ঘামানোর মতো কিছু নেই।”

“এক মিনিট।” মৃদু হেসে বলে পোয়্যারো, “এসে যখন পড়েইছি, তখন… আচ্ছা মিসেস ফার্লে, আপনার স্বামী কি কখনো কারো দ্বারা সম্মোহিত হয়েছিলেন?”

“আপনি ওই স্বপ্নটার কথাই ভাবছেন, তাই না?” মিসেস ফার্লের গলাটা আতঙ্কে আর শোকে রুদ্ধ হয়ে যায়। “না, ম্যসিয়েঁ পোয়্যারো। আমার স্বামী কখনো সম্মোহিত হননি, এই নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহও ছিল না। শুধু ওই স্বপ্নটা… রাতের পর রাত... ওটাই বার বার বলতে শুনেছি। ওঁর কথা শুনে মনে হত, সব শেষ না হওয়া অবধি যেন উনি শান্তি পাবেন না।”

স্যার বেনেডিক্টের কথাগুলো পোয়্যারোর মাথায় নতুন করে ঘুরপাক খেতে লাগল।

“আচ্ছা, সাম্প্রতিক কালে আপনার স্বামীর কোনো আচরণ দেখে আপনার কখনো অদ্ভুত বলে কিছু মনে হয়েছিল?” নীচু স্বরে জানতে চাইল পোয়্যারো, “মানে এই যে উনি নিজেকে একেবারে শেষ করে দিতে চান?”

“না। তবে…” মিসেস ফার্লের গলায় কান্না উদ্গত হয়ে আসে, “আবার কখনো কখনো মনে হত যেন…”

“বাবা আত্মহত্যা করতেই পারেন না ম্যসিয়েঁ পোয়্যারো।” জোয়ানা ফার্লের স্পষ্ট গলাটা ঘরের সংশয়াচ্ছন্ন আবহাওয়ার মধ্যে একটা জোরালো আলোর মতো ঝলসে উঠল। “স্যার বেনেডিক্ট ফার্লে নিজের ব্যাপারে খুব বেশিরকম সতর্ক থাকতেন। ওসব অলীক ভাবনাও তিনি প্রশ্রয় দিতেন না।”

“কিন্তু যাঁরা দশবার আত্মহত্যা করার কথা বলেন,” ডক্টর স্টিলিংফ্লিট প্রতিবাদ করলেন, “বাস্তবে কিন্তু তাঁরা নন, বরং অন্যরাই আত্মঘাতী হয়। সেজন্যই অর্ধেক আত্মহত্যার কোনো অর্থ খুঁজে পাই না আমরা।”

একটা বড়ো শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল পোয়্যারো। ইন্সপেক্টর বার্নেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “যেখানে এই ঘটনাটা ঘটেছে, সেই ঘরটা, মানে অকুস্থলটা কি একবার দেখা যায়?”

“অবশ্যই।” শশব্যস্ত হন বার্নেট। তাঁর ইশারায় স্টিলিংফ্লিট পোয়্যারোকে সঙ্গে নিয়ে দোতলায় সেই ঘরে ঢোকেন। এই সেই ঘর যেখানে গতবার ঢুকতে চেয়েও শেষপর্যন্ত...

“অদ্ভুত!” স্টিলিংফ্লিট শেষপর্যন্ত বলেই ফেলেন কথাটা। “এমন একজন ধনী মানুষ নিজের জন্য এমন একটা জেলখানা টাইপের ঘর বেছেছিলেন কেন?”

স্যার বেনেডিক্টের মনস্তত্ত্বের জটিলতায় না গিয়েও পোয়্যারো এ বিষয়ে একমত। জানালা দিয়ে দেখা ন্যাড়া ইটের বিশাল লম্বা দেওয়াল, দু-পাশের রাস্তা দিয়ে মাথা খারাপ করে দেওয়া আওয়াজ তুলে যাতায়াত করতে থাকা লরির সারি—এর মধ্যে স্বেচ্ছায় থাকা মানে হাজতবাসই বটে।

পোয়্যারোর হঠাৎ নজর পড়ে টেবিলের ওপর রাখা একটা চিমটে জাতীয় লেজি টং-এর ওপর। সেটাকে যথাসম্ভব লম্বা করে তাই দিয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকা একটা দেশলাইয়ের কাঠিকে আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলতে গিয়ে পোয়্যারোর মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

“আপনার খেলাধুলো যদি শেষ হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে আমরা এবার আমরা…” বিরক্ত গলায় বলেন স্টিলিংফ্লিট।

“জিনিসটা কিন্তু খুব কাজের।” বলে আঁকশিটা আবার টেবিলে রেখে পোয়্যারো স্টিলিংফ্লিটের দিকে প্রশ্নটা ছুড়ে দেয়, “মৃত্যুর সময় কে কোথায় ছিলেন?”

“মিসেস ফার্লে এর ওপরের তলায় নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। মিস ফার্লে চিলেকোঠায় নিজের স্টুডিওতে ছবি আঁকছিলেন।”

টেবিলে আঙুল দিয়ে কিছুক্ষণ কী একটা আনমনে ভেবে পোয়্যারো বলল, “মিস ফার্লে, মানে জোয়ানাকে একবার ডেকে দেবেন?”

পোয়্যারোর দিকে কৌতূহলী চোখে একবার তাকিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন স্টিলিংফ্লিট।

একটু পরেই ঘরে ঢুকলেন জোয়ানা ফার্লে।

“ব্যাপারটা হয়তো বড়ো রূঢ় শোনাবে,” মাফ চাওয়ার ভঙ্গিতে বলে ওঠে পোয়্যারো, “তবু আমার কয়েকটা প্রশ্ন আছে আপনার কাছে।”

“আপনি নিঃসংশয়ে যা খুশি জিজ্ঞেস করতে পারেন ম্যসিয়েঁ পোয়্যারো।” জোয়ানা পোয়্যারোকে আশ্বস্ত করেন।

“আপনি তো আপনার বাবার প্রথম পক্ষের সন্তান, তাই না? আসলে আপনার মুখশ্রীর সঙ্গে স্যার বেনেডিক্টের মিল থাকলেও মিসেস ফার্লের সঙ্গে একেবারেই নেই। আপনি কি জানতেন যে আপনার বাবা এই ড্রয়ারটাতে একটা রিভলভার রাখেন?”

“না। আপনার পর্যবেক্ষণ শক্তি সত্যিই প্রশংসনীয়।”

“ধন্যবাদ।”

“আচ্ছা, মনে করে বলুন তো যে গত বৃহস্পতিবার আপনি আর আপনার মা মানে সৎ-মা ঠিক কোথায় ছিলেন।”

“গত বৃহস্পতিবার?” জোয়ানার ভ্রূ কুঁচকে ওঠে। “ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আমরা হাউসে সিনেমা দেখতে গেছিলাম।”

“সে কি! আপনার বাবা আপনাদের সঙ্গে যাননি?”

“আমার বাবা!” জোয়ানার মুখটা ক্লিষ্ট হাসিতে ভরে যায়। “তাঁর মতো তিতকুটে মেজাজ খুব কম মানুষেরই হয়, মানে হত ম্যসিয়েঁ পোয়্যারো। কোনোদিনই সিনেমা-থিয়েটার-অপেরা কিচ্ছুটি দেখবার মানুষ তিনি ছিলেন না। সারাজীবন পাগলের মতো শুধু টাকাকেই ভালোবেসেছেন। এমনকি একটি ছেলে—গরিব, কিন্তু সৎ—আমাকে সে বিয়ে করতে চেয়েছিল। বাবা তাকেও বরখাস্ত করেন, কারণ তিনি ভেবেই রেখেছিলেন, আমাকে তাঁর ইচ্ছেমতো জায়গাতেই বিয়ে করতে হবে।”

“আপনার স্পষ্ট কথাগুলো শুনে ভালো লাগছে মাদমোঁয়াজেল।” গম্ভীর গলায় বলে পোয়্যারো, “কিন্তু আপনি আপত্তি করেননি কেন?”

“আমার আপত্তি করার কোনো সুযোগই ছিল না। এই বাড়ি ছাড়া আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তাছাড়া…” জোয়ানার গলাটা তরল হয়ে যায়, “বাবার মৃত্যুর পর লুইস, মানে আমার সৎ-মা একটা মোটা টাকা পেলেও বাকি সম্পত্তি তো আমারই হওয়ার ছিল।”

“এবারে আমার আর দুটো শেষ প্রশ্ন আছে।” পোয়্যারো জিজ্ঞাসা করে, “প্রথমটা হল, এই আঁকশিটা কি এই টেবিলেই রাখা থাকত?”

“হ্যাঁ। বাবা নীচু হয়ে কিছু তোলা পছন্দ করতেন না বলে এটা দিয়েই জিনিস-টিনিস তুলতেন।”

“দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনার বাবার দৃষ্টিশক্তি কেমন ছিল?”

“খুব খারাপ। চশমা ছাড়া বাবা প্রায় অন্ধই ছিলেন।”

“আর চশমা পরে?”

“তখন একদম স্পষ্ট দেখতে পেতেন। খুদে খুদে হরফও পড়তে পারতেন।”

“বেশ। আপনাকে বিব্রত করার জন্য আমি দুঃখিত।”

জোয়ানা ফার্লেকে বিদায় জানিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বের করে নীচে তাকাল পোয়্যারো। কারখানার খাড়াই দেওয়াল আর বাড়ির পাঁচিলের মাঝে একটা ছোটোখাটো কালচে জিনিসের অস্তিত্ব ওপর থেকেও বোঝা গেল। সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে মুখ থেকে ক’টা শব্দ বেরিয়ে এল, “যাক, এতক্ষণে হিসেব মিলেছে।”


স্টাডিতে তখনো বসে ছিলেন সবাই। পোয়্যারো সেক্রেটারিকেই ধরলেন আগে।

“আচ্ছা, আমাকে ডেকে পাঠানোর ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন তো মিস্টার কর্নওয়ার্দি। মানে ঠিক কখন স্যার বেনেডিক্ট আপনাকে এই ব্যাপারে নির্দেশ দেন?”

“বুধবার বিকেলেই আপনার উদ্দেশ্যে চিঠিটা ডিক্টেট করে বলেন, আমি যেন নিজেই চিঠিটা পোস্ট করি।”

“তারপর?”

“হোমস, মানে বাটলারকে যেন আমি বলে রাখি, সেদিন চিঠিটা দেখে নিঃসংশয় হলে তবেই সে যেন আপনাকে ঢুকতে দেয়। স্যার এও বলেন যে তিনি আমার ঘরে আপনার সঙ্গে দেখা করবেন। তাই আমাকে বৃহস্পতিবার সন্ধেটা ছুটি দেওয়া হয়।”

“আদেশগুলো আপনার কানে একটু অন্যরকম ঠেকেনি?”

“ঠেকেছিল। তবে...” কাঁধ ঝাঁকান কর্নওয়ার্দি, “আসলে স্যার নিজেই তো অন্যরকম মানুষই ছিলেন।”

হোমস, অর্থাৎ বাটলারের কাছ থেকেও নতুন কিছু জানা গেল না। সে জানাল যে হিউগো কর্নওয়ার্দি তাকে ঠিক এই কাজগুলোই করতে বলে সাড়ে আটটা নাগাদ বেরিয়ে যান, ফেরেন অনেক পরে।

“আপনার স্বামীর দৃষ্টিশক্তি ঠিক কেমন ছিল মাদমোঁয়াজেল?” হঠাৎ করেই পোয়্যারো জানতে চায় মিসেস ফার্লের দিকে ঘুরে।

“চোখের ব্যাপারে বলতে গেলে…” একটু অস্বস্তিতে পড়েও সামলে নেন মিসেস ফার্লে। “আপনি ওঁর দৃষ্টিশক্তিরই কথা বলছেন তো? খুব খারাপ। চশমা ছাড়া উনি প্রায় অন্ধই ছিলেন বলা চলে।”

“আচ্ছা, উনি কি একাধিক চশমা ব্যবহার করতেন?”

“অবশ্যই।”

“আহ্!” একটা পরিতৃপ্তির শ্বাস ফেলে পোয়্যারো বলে ওঠে, “বোঝা গেল।”

সবাই অবাক হয়ে পোয়্যারোর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মিসেস ফার্লেই প্রশ্নটা করলেন, “কী বোঝা গেল?”

“সবটাই। স্যার বেনেডিক্ট ফার্লের মৃত্যুরহস্য, আমাকে ডেকে পাঠানো, ওই স্বপ্ন…” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে পোয়্যারো, “আসলে সেদিন সন্ধেবেলাটায় এমন বেশ কিছু জিনিস ঘটেছিল যেটার কোনো মানেই এতক্ষণ খুঁজে পাইনি আমি। যেমন ধরুন না, আমাকে চিঠিটা সঙ্গে কেন নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল?”

“পরিচয়পত্র হিসেবে...” কর্নওয়ার্দি কথাটা বলতে গিয়েও চুপ করে যান।

“তাই নাকি?” পোয়্যারো হেসে ওঠে। “তার জন্য অন্য অনেক কিছু আছে। তাছাড়া সেদিন আমাকে শুধু চিঠিটা সঙ্গে করে আনতেই হয়নি, স্যার বেনেডিক্ট খুব স্পষ্টভাবেই আমার কাছ থেকে সেটা চেয়েও নিয়েছিলেন। কেন বলুন তো?”

“যাতে ওঁর কিছু হলেও,” জোয়ানা ফার্লে বলে ওঠেন, “আমরা জানতে পারি যে উনি আপনাকে ডেকেছিলেন।”

“একদম ঠিক বলেছেন।” পোয়্যারো বলে ওঠে, “ওই চিঠিটা চেয়ে নেওয়ার পেছনে একটাই উদ্দেশ্য ছিল। স্যার বেনেডিক্টের মৃত্যুর পর তাঁর কাগজের মধ্যে ওটা পেলে আমাকে ডাকা হবেই এবং তখন আমার মুখেই সবাই শুনবে সেই সন্ধ্যায় শোনা ওই অবিশ্বাস্য স্বপ্নের কথা।”

ততক্ষণে ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা জমাট বেঁধে উঠেছে। কিন্তু পোয়্যারো নির্বিকারভাবে বলে চলে, “আরো একটা ব্যাপার ভাবুন। স্বপ্নের কথাটা শোনার পর আমি যখন স্যার বেনেডিক্টকে অনুরোধ করলাম, পাশের ঘরটা, বিশেষত ওই ড্রয়ার আর রিভলভারটা দেখাতে, তখন তিনি প্রথমে রাজি হয়েছিলেন, এমনকি উঠেও দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু তারপর তিনি সোজা ‘না’ বলে দেন। কেন?”

কোনো উত্তর এল না। পোয়্যারো আবার বলে উঠল, “আচ্ছা বেশ। প্রশ্নটা আমি একটু অন্যভাবে করি। পাশের ঘরে তখন কী ছিল, যেটা স্যার বেনেডিক্ট আমাকে দেখতে দিতে চাননি?”

নৈঃশব্দ্য আরো দীর্ঘায়িত হল।

“এবার আপনারাও নিশ্চয় বুঝতে পারছেন,” ধীর গলায় বলে পোয়্যারো, “সেই সময় পাশের ঘরে এমন কিছু বা কেউ ছিল, যাকে আমার চোখের আড়ালে রাখার জন্যই তার পাশের, অর্থাৎ মিস্টার কর্নওয়ার্দির ঘরে আমাকে বসানো হয়। স্বাভাবিকভাবেই স্যার বেনেডিক্টের ঘরখানায় আমাকে নিয়ে যাওয়া তখন সম্ভব ছিল না।”

“কী ছিল সেখানে?”

“বলছি। তার আগে তিন নম্বর অসঙ্গতির কথাটা বলি। সেদিন সন্ধ্যায় আমি বেরিয়ে আসার ঠিক আগে স্যার বেনেডিক্ট আমার কাছ থেকে চিঠিটা চেয়ে নিতে চান। এবার, স্রেফ বেখেয়ালে আমি বাঁ পকেটে রাখা চিঠিটা, মানে যেটা মিস্টার কর্নওয়ার্দি লিখেছিলেন, না দিয়ে ডান পকেটে রাখা একটা অন্য কাগজ তাঁর হাতে দিই। তিনি সেটাতে চোখ বুলিয়ে পাশের টেবিলে রেখেও দেন। একটু পরে আমার খেয়াল হয়, আমি ওঁর হাতে যেটা দিয়েছি সেটা চিঠিটা ছিল না। সেটা ছিল আমার ধোপাবাড়ির একটা মামুলি রসিদ। তাহলে এবার প্রশ্ন, সেটার ওপর চোখ বুলিয়েও স্যার বেনেডিক্ট কেন তক্ষুনি গোলমালটা ধরতে পারেননি?”

“উনি কি তখন চশমা পরেননি?” বার্নেট জানতে চান।

“আগাগোড়াই পরে ছিলেন।” মুচকি হেসে বলে পোয়্যারো, “আর সেজন্যই তো ব্যাপারটা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠে।”

সামনে ঝুঁকে নীচু স্বরে পোয়্যারো বলতে থাকে, “এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ছিল ওই স্বপ্নটা। স্যার বেনেডিক্ট ক্রমাগত স্বপ্ন দেখেই চলেছেন, যে তিনি নিজের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ড্রয়ারে রাখা রিভলভার দিয়ে আত্মহত্যা করছেন। ক’দিন পর তাঁকে নিজের ঘরে, জানালার ধারে, নিজের রিভলভারটা হাতের কাছে নিয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেল। সেই সময় ঘরে আর কেউ ছিল না। ঘরে তার আগে পরে কেউ ঢোকেনি। অর্থাৎ, এটা একটা আত্মহত্যা। তাই তো? কিন্তু না! এটা আত্মহত্যা ছিল না। এটা ছিল ঠান্ডা মাথায় করা একটা খুন।”

ঘরের সবাই নড়েচড়ে বসে। একটা গুঞ্জন ওঠে। সেসবের পরোয়া না করে পোয়্যারো বলে চলে, “সেদিন সন্ধ্যায় স্যার বেনেডিক্টের অফিসে ঢুকলে আমি হয়তো এমন কিছু দেখে ফেলতাম, যাতে এই ‘আত্মহত্যা’ নামক সাজানো নাটকটি সম্ভব হত না। কারণ, সেদিন সেই ঘরে তখন ছিলেন স্যার বেনেডিক্ট স্বয়ং!”

স্তম্ভিত মুখে সমবেত সবার দিকে তাকিয়ে পোয়্যারো মৃদু হাসিটি হাসল। “আপনারাই ভেবে দেখুন, যদি আমার সামনে সেদিন বসে থাকা মানুষটি স্যার বেনেডিক্টই হতেন, তাহলে কি তিনি চিঠি আর ধোপাবাড়ির নোটিসের পার্থক্য বুঝতে পারতেন না? এটা একমাত্র তখনই সম্ভব, যদি স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তির অধিকারী কেউ একটা সাংঘাতিক পাওয়ারের চশমা চোখে থাকে। ওই অবস্থায় সে কার্যত অন্ধ হয়ে থাকবে, তাই না?”

“হ্যাঁ, একদম ঠিক।” ঠোঁট চেপে বলেন স্টিলিংফ্লিট।

“তার সঙ্গে যোগ করুন পুরো সময়ে আমার অনুভূতিটা। আমার মনে হয়েছিল, সেদিন আমি কোনো নাটক দেখছি শুনছি। ঘর নয়, সেদিন ওটা একটা মঞ্চ হিসেবেই সাজানো হয়েছিল। ঘরের একমাত্র আলোটা তাক করা ছিল আমার ওপর। তার পেছনে অন্ধকারে বসে থাকা মানুষটির কতটুকু আমি দেখতে পেয়েছিলাম? একটা জীর্ণ ড্রেসিং গাউন, টিয়াপাখির মতো বাঁকা নাক, চুলের মধ্যে একটা সাদাটে গুচ্ছ, এগুলোর প্রত্যেকটাই খুব সহজে জোগাড় করা বা মেক-আপ দিয়ে বানানো যায়। রইল বাকি মানুষটির চোখজোড়া, তাও ঢাকা পড়েছিল পুরু চশমার আড়ালে। কিন্তু কেন? যাতে আমাকে একথা বোঝানো যায় যে স্যার বেনেডিক্ট ওই বিশেষ স্বপ্নটা দেখতেন। উনি আমাকে না বললে এবং চিঠির সূত্রে হাজিরা দিয়ে আমি আপনাদের না বললে তো কেউ জানতেই পারত না স্বপ্নটার কথা।”

“কিন্তু মিসেস ফার্লে যে বললেন…” বার্নেট থেমে যান।

 পোয়্যারো সম্মতি জানায় তাতে। “এই পুরো ব্যাপারটা দুজনের মাথা থেকে বেরোয়। একজন হলেন সেই ব্যক্তি যাঁর কাছে আমাকে চিঠি লেখার জন্য স্যার বেনেডিক্টের রাইটিং প্যাড  ছিল, বেল না বাজিয়ে এই বাড়িতে ঢোকার চাবি ছিল আর রাত্তির ন’টা বাজার আগে বাড়িতে ঢুকে নিজের ঘরেই সাজগোজ করে তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল, আর আমাকে শোনানোর জন্য গল্পটাও ছিল।

“আরেকজন অবশ্য তখন ধারেকাছে ছিলেনই না। তাঁর কাজ ছিল স্যার বেনেডিক্টের মৃত্যুর পর সবাইকে বানানো গপ্পোটি বলা, যাতে লোকে ভাবে, মানুষটি রাতের পর রাত স্বপ্নটা দেখে মনে মনে দুমড়ে যাচ্ছিলেন। অথচ স্যার বেনেডিক্ট ফার্লে আদৌ ওরকম কোনো স্বপ্ন কোনোদিনই দেখেননি।”

ইন্সপেক্টর বার্নেট সতর্ক ছিলেন। তাই ঘরের মধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হওয়ার আগেই কনস্টেবলরা পজিশন নিয়ে নিল দরজার কাছে। ঘরটা শান্ত হয়ে গেল।

“তাহলে এবার আসা যাক খুনের দিনের কথায়।” খুব স্বাভাবিকভাবে একটা গল্প বলার মতো করেই বলে পোয়্যারো, “দরজার বাইরে বসে থাকা দুজন সাক্ষী একথা বলবেন যে সেদিন স্যার বেনেডিক্টের ঘরে কেউ ঢোকেনি। কথাটা একদম ঠিক। পাশের, মানে নিজের ঘরে মিস্টার কর্নওয়ার্দি তখন সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। সুযোগ এল সাড়ে তিনটে নাগাদ, যখন ফ্যাক্টরি থেকে বেশ কয়েকটা লরি বেরোল। কর্নওয়ার্দি তখন জানালা দিয়ে বাইরে ঝুঁকে স্যার বেনেডিক্টের টেবিল থেকে আগেই সরিয়ে নেওয়া এই আঁকশি দিয়ে একটা জিনিস তাঁর ঘরের জানালার বাইরে কার্নিশের ওপর নিয়ে গেলেন।”

“কী ছিল সেটা?”

“আমি ওপর থেকে দেখেছি, তাই নিশ্চিত নই। তবে ইন্সপেক্টর বার্নেট যদি এখনই এই বাড়ির পাঁচিল আর কারখানার দেওয়ালের মাঝের জায়গাটা খোঁজান, তাহলে তিনি সেখানে একটা ছোট্ট কালো বেড়ালের পুতুলজাতীয় খেলনা পাবেন বলেই আমার ধারণা। কর্নওয়ার্দি ভেবেছিলেন, ওটাকে কোনো বাচ্চার কাজ বলে চালিয়ে দেবেন, যদিও-বা কেউ ওটা খুঁজে পেত।

“নিজের পেছনে একটা বেড়াল দেখেই স্যার বেনেডিক্ট যে দারুণ রেগে যাবেন এবং জানালা দিয়ে ঝুঁকে বেড়ালটাকে তাড়াতে চাইবেন, এটা কর্নওয়ার্দি জানতেন। ঠিক তখনই বিশাল আওয়াজ তুলে লরিগুলো পাশের রাস্তা দিয়ে যায়। জানালা দিয়ে স্যার বেনেডিক্ট মুখ বের করা মাত্র কর্নওয়ার্দি তাঁকে গুলি করেন। ও-পাশে একটা ন্যাড়া দেওয়াল, তাই এই কাণ্ডটা দেখার কেউ ছিল না।

“আধঘণ্টা পর নাটকের বাকি অংশটা অভিনীত হয়। কয়েকটা কাগজের মধ্যে রিভলভার আর আঁকশিটা লুকিয়ে সেগুলো সই করানোর অজুহাতে পাশের ঘরে গিয়ে কর্নওয়ার্দি সবকিছু সাজিয়ে ফেলেন। আমাকে লেখা চিঠিটাও জায়গামতো রেখে দেওয়া হয়। রিভলভারে স্যার বেনেডিক্টেরর হাতের ছাপও স্পষ্টভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়।

“রিভলভারটা কর্নওয়ার্দিই জোগাড় করেছিলেন। বেনেডিক্ট ফার্লের মতো মানুষ নিজের ড্রয়ারে রিভলভার রাখতেন না।

“আত্মহত্যা করা মানুষটির দেহ কর্নওয়ার্দিই আবিষ্কার করেন। বাকিটা হয় কথায় কথায়। হতভাগ্য মিসেস ফার্লে আভাসে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন, ভেতরে ভেতরে স্যার বেনেডিক্ট মানসিক রোগে অসুখী ছিলেন। ওস্তাদের মার হওয়ার কথা ছিল এই স্বপ্নের ব্যাপারটা। আমার মুখ থেকে এটা শোনার পর তো আত্মহত্যা নিয়ে আর কোনো সংশয়ই থাকার কথা নয়! আর তারপর একজন পেতেন স্বামীর সম্পত্তি, অন্যজন পেতেন তাঁর কাছ থেকে পারিশ্রমিক হিসেবে একটা মোটা টাকা। তাই না?

“আরেকটা কথা প্রসঙ্গত বলে রাখি, কেউ রিভলভার দিয়ে আত্মহত্যা করলে সাধারণত চোয়ালে নল ঠেকিয়ে বা মুখের মধ্যে নলটি ঢুকিয়ে কর্মটি করেন বা কপালে গুলি চালালেও তা হয় পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে। স্যার বেনেডিক্টের মাথায় লাগা গুলিটি কমপক্ষে চার কি পাঁচ ফুট দূরত্ব থেকে এসে লাগে। কাজেই...”

হিউগো কর্নওয়ার্দি আর লুইস ফার্লে পোয়্যারোর প্রশ্নের আর কোনো উত্তর দেননি, তবে তাঁদের মুখের ছাইরঙা চেহারা দেখে বার্নেট যা বোঝার বুঝে নিয়েছিলেন। তাঁর জেরার সামনে চটপট ভেঙে পড়েছিলেন লুইস ফার্লে। তারপর তাঁদের দুজনের একটাই পরিণতি হওয়ার ছিল। তবে এমনটা যে শেষমেশ হবে, এ বোধ হয় তাঁরা চরম দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি।

বার্নেট পোয়্যারোকে ঠাট্টা করে বলেন, “আচ্ছা ভায়া, তুমি যদি কখনো অপরাধ করো, তাতে তো এসব ফাঁক থাকার কথাই থাকবে না। কী বলো হে?”

বন্ধুর এহেন রসিকতায় পোয়্যারো কিঞ্চিৎ ছদ্মগাম্ভীর্য দেখিয়ে বলে ওঠে, “তাই বটে। তবে তার আপাতত সম্ভাবনা নেই।”


___

অঙ্কনশিল্পীঃ সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী


No comments:

Post a Comment